ব্রোঞ্জব্যাক: গাছের ডালে ঝলমলে তামাটে তীর
বাগানের আমগাছ বা বাঁশঝাড়ের ডালে হঠাৎ একটা সরু, তামাটে-বাদামি সাপকে বিদ্যুৎগতিতে এক ডাল থেকে আরেক ডালে চলে যেতে দেখেছেন? খুব সম্ভবত সেটি ব্রোঞ্জব্যাক, বৈজ্ঞানিক নাম Dendrelaphis tristis, ইংরেজিতে Common Bronzeback Tree Snake। গ্রামের অনেকে একে "তামা সাপ" বা "গেছো সাপ" বলেও ডাকেন। এটি কলুব্রিডি পরিবারের নির্বিষ, দিনচর ও গেছো স্বভাবের সাপ, যার কামড়ে মানুষের কোনো বিষক্রিয়া হয় না।
চেহারা দেখে চেনা
ব্রোঞ্জব্যাক লম্বায় সাধারণত এক মিটারের আশপাশে, বড় নমুনা দেড় মিটার ছাড়াতে পারে। কিন্তু শরীর এত সরু যে প্রথম দেখায় দড়ির টুকরো মনে হয়। লেজ মোট দৈর্ঘ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। পিঠ জুড়ে চকচকে ব্রোঞ্জ বা তামাটে-বাদামি রং, তার নিচে দুই পাশে লম্বালম্বি একটি সরু ফিকে হলুদ বা ক্রিম রেখা চলে গেছে, যার নিচের কিনারায় থাকে কালচে সরু দাগ। পেট সবুজাভ বা হলুদাভ সাদা।
এর মাথা লম্বাটে, চোখ বেশ বড় এবং মণি গোল। পিঠের মাঝ বরাবর মেরুদণ্ডের ওপরের আঁশের সারিটি দুপাশের আঁশের চেয়ে স্পষ্টভাবে চওড়া, যা Dendrelaphis গণের বৈশিষ্ট্য। শরীরের মাঝখানে সাধারণত ১৫ সারি মসৃণ আঁশ থাকে। উত্তেজিত হলে সাপটি শরীর ফোলায়, তখন আঁশের ফাঁকে নীলচে ত্বকের ঝিলিক চোখে পড়ে। ঘাড়ের কাছে লালচে আভা দেখা গেলে অনেকে সেটাকে অন্য প্রজাতি ভাবেন, কিন্তু ঘাড়ে লাল আভা বেশি স্পষ্ট হয় পূর্বাঞ্চলের আরেক প্রজাতি Painted Bronzeback-এ (Dendrelaphis pictus)।
বিস্তার ও বাসস্থান
এই প্রজাতির বিস্তার ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের কিছু অংশ জুড়ে। ভারতের প্রায় সমগ্র সমতল ও মাঝারি উচ্চতার পাহাড়ি অঞ্চলে এরা আছে। পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার শহরতলির বাগানবাড়ি থেকে বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার শালবন, আবার উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্সের বনাঞ্চল সবখানেই ব্রোঞ্জব্যাকের দেখা মেলে।
এরা প্রধানত গাছে থাকে। ঝোপঝাড়, বাগান, বাঁশবন, নারকেল ও সুপারি গাছ, বেড়ার লতাপাতা এদের প্রিয় জায়গা। মাঝে মাঝে শিকারের পিছু নিয়ে মাটিতে নামে, আবার বাড়ির জানালার গ্রিল বা ছাদের কার্নিশ ধরে ঘরেও ঢুকে পড়ে। আর্দ্র ও শুকনো দুই ধরনের বনেই এদের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আছে।
আচরণ: দিনের চটপটে শিকারি
ব্রোঞ্জব্যাক দিনের আলোয় সক্রিয় থাকে এবং দৃষ্টিশক্তির ওপর নির্ভর করে শিকার খোঁজে। এদের সবচেয়ে চমকপ্রদ দক্ষতা হলো এক ডাল থেকে দূরের ডালে লাফিয়ে যাওয়া। শরীরের পেছনের অংশ ডালে আটকে রেখে সামনের অংশ শূন্যে বাড়িয়ে দেয়, তারপর ঝটকায় শরীর সোজা করে অন্য ডাল ধরে ফেলে। পেটের আঁশের দুই প্রান্তে খাঁজ থাকায় খাড়া গাছের গুঁড়িতেও এরা অনায়াসে উঠে যায়।
মানুষ দেখলে এরা সাধারণত স্থির হয়ে ডালের রঙে মিশে যায় বা দ্রুত পালায়। ধরা পড়লে কামড়াতে পারে, কিন্তু ছোট দাঁতের সেই কামড়ে সামান্য আঁচড়ের বেশি কিছু হয় না। অনেক সময় ধরা পড়লে দুর্গন্ধযুক্ত তরল ছাড়ে, যা শিকারিকে বিরক্ত করার একটা কৌশল।
খাবার কী খায়
ব্রোঞ্জব্যাকের খাদ্যতালিকার বড় অংশ জুড়ে আছে গেছো ব্যাঙ ও টিকটিকি জাতীয় সরীসৃপ, যেমন গিরগিটি ও অন্যান্য ছোট লিজার্ড। সুযোগ পেলে এরা পাখির ছানা ও ডিমও খায়। শিকার চোখে পড়লে মাথা সামান্য দুলিয়ে দূরত্ব মেপে নেয়, তারপর দ্রুত ছোবলে ধরে গিলে ফেলে। এরা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করার কৌশল ব্যবহার করে না।
প্রজনন
ব্রোঞ্জব্যাক ডিম পাড়ে। ভারতে সাধারণত মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে স্ত্রী সাপ গাছের ফোকরে, পচা কাঠের ভেতরে বা পাতার স্তূপে ছয় থেকে আটটির মতো লম্বাটে ডিম পাড়ে বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে জানা যায়। ডিম ফুটে বেরোনো বাচ্চারা দেখতে প্রায় বড়দের মতোই, শুধু আকারে ছোট, আর প্রথম দিন থেকেই ছোট টিকটিকি বা ব্যাঙাচি ধরে খেতে পারে।
সংরক্ষণ অবস্থা ও আইন
IUCN লাল তালিকায় Dendrelaphis tristis "Least Concern" হিসেবে চিহ্নিত। বিস্তৃত এলাকা আর মানুষের বাগানে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এর বড় সহায়। তবে বাগান ও ঝোপ কেটে ফেলা, কীটনাশকের কারণে ব্যাঙ-টিকটিকি কমে যাওয়া এবং "গেছো সাপ মানেই বিষধর" এই ভয়ে মেরে ফেলা এদের প্রধান বিপদ।
ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী দেশের বন্য সাপ ধরা, মারা, পোষা বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ। ব্রোঞ্জব্যাক ঠিক কোন তফসিলে রয়েছে তা নিশ্চিতভাবে যাচাই করতে বন দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখা উচিত, কিন্তু আইনগতভাবে একে বিরক্ত না করাই নিরাপদ পথ।
ভুল ধারণা বনাম বাস্তব
গ্রামে বলা হয়, গাছের সাপ উড়ে এসে মানুষের মাথায় ছোবল মারে। বাস্তবে ব্রোঞ্জব্যাক উড়তে পারে না, কেবল কাছাকাছি ডালে লাফিয়ে যায়, আর মানুষকে আক্রমণ করার কোনো প্রবণতা এর নেই। লাফ দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো পালানো বা শিকার ধরা।
আরেকটি ধারণা, তামাটে রঙের যেকোনো সরু সাপ বিষাক্ত। রং দিয়ে সাপের বিষ বিচার করা যায় না। তবে সাধারণ মানুষের পক্ষে সব সময় সঠিক প্রজাতি চেনা কঠিন, তাই অচেনা যেকোনো সাপকে দূর থেকে দেখাই ভালো। আবার কেউ কেউ ভাবেন ব্রোঞ্জব্যাক বাড়িতে এলে ঘরে বিষধর সাপও আসবে। এর কোনো প্রমাণ নেই; ব্রোঞ্জব্যাক আসে টিকটিকি আর ব্যাঙের খোঁজে।
পরিবেশে ব্রোঞ্জব্যাকের ভূমিকা
বাগানে টিকটিকি, ব্যাঙ আর পোকামাকড়ের একটা ভারসাম্য থাকে, আর ব্রোঞ্জব্যাক সেই শৃঙ্খলের মাঝখানের এক শিকারি। আবার শিকরে বাজ, ঈগল, বনবিড়াল আর বড় সাপ এদের শিকার করে। ফলে এই সাপটির উপস্থিতি বলে দেয় এলাকার সবুজ পরিবেশ এখনও জীবন্ত। পাখি দেখার মতো করেই অনেক প্রকৃতিপ্রেমী এখন ক্যামেরায় এদের ছবি তোলেন, যা সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করছে।
অনুরূপ সাপের সঙ্গে পার্থক্য
পশ্চিমবঙ্গে ব্রোঞ্জব্যাকের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি গুলিয়ে ফেলা হয় দাঁড়াশের বাচ্চা আর কুকরি বা উলফ স্নেকের মতো কিছু সাপকে। দাঁড়াশের বাচ্চার গায়ে আড়াআড়ি ডোরা থাকে এবং মাথা তুলনায় ভোঁতা, অথচ ব্রোঞ্জব্যাকের গায়ে লম্বালম্বি হালকা রেখা আর পিঠের মাঝের চওড়া আঁশের সারি স্পষ্ট। বিষধর শাঁখামুটি বা কালাচের সঙ্গে এর কোনো মিলই নেই; কালাচের গায়ে কালো-সাদা আড়াআড়ি বলয় আর শাঁখামুটির গায়ে হলুদ-কালো চওড়া বলয় থাকে, এবং দুটোই রাতে চলাফেরা করে। ব্রোঞ্জব্যাক দিনের আলোয় গাছে, তাই সময় আর জায়গা দেখেও অনেকটা আন্দাজ পাওয়া যায়।
শহরে ব্রোঞ্জব্যাক
কলকাতা, হাওড়া বা শিলিগুড়ির মতো শহরেও যেখানে পুরনো বাগান, পার্ক বা গাছে ঘেরা আবাসন আছে, সেখানে ব্রোঞ্জব্যাক টিকে থাকতে পারে। সাপ উদ্ধারকারীদের কাছে আসা ফোনের মধ্যে এই সাপ বেশ পরিচিত নাম, কারণ জানালার পর্দা বা বারান্দার টবের গাছে এদের পাওয়া যায়। শহরের সবুজ কমে গেলে এদের খাবার আর লুকোনোর জায়গা দুটোই কমে, তাই বাড়ির আশপাশে কিছু দেশি গাছ রাখা এই ছোট সাপের জন্যও উপকারী।
ব্রোঞ্জব্যাক দেখলে কী করবেন
- সাপটি গাছে থাকলে কাছে গিয়ে ডাল নাড়াবেন না; কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে দেখুন, সে নিজেই সরে যাবে।
- ঘরে ঢুকলে জানালা-দরজা খুলে দিন, ঘরে আলো জ্বালিয়ে মানুষজন সরিয়ে নিন।
- সাপ আটকে পড়লে বা আহত হলে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরের সাহায্য নিন; নিজে ধরার চেষ্টা করবেন না।
- শিশুদের শেখান যে গাছের সাপ দেখলে ঢিল ছোড়া বা ভিডিও তুলতে কাছে যাওয়া ঠিক নয়।
ছোট্ট, সুন্দর এই গেছো সাপটি আমাদের বাগানের নীরব পাহারাদার। একে চিনতে পারলে অহেতুক ভয় আর অহেতুক হত্যা দুটোই কমবে।