লাউডগা সাপ: লতার মতো সবুজ, তীক্ষ্ণ নাকের শিকারি
সবুজ লতাপাতার ভেতর থেকে হঠাৎ একটা লাউয়ের ডগার মতো সরু সবুজ সাপ মাথা বের করলে চমকে ওঠা স্বাভাবিক। বাংলায় একে লাউডগা বলা হয়, ইংরেজিতে Green Vine Snake, আর বহুদিনের প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Ahaetulla nasuta। তবে ২০২০ সালে Mallik ও সহযোগীদের গবেষণার (Zootaxa 4874) পর এই নামটি কঠোর অর্থে শুধু শ্রীলঙ্কার সাপের জন্য রাখা হয়েছে; ভারতের লাউডগাগুলো এখন কয়েকটি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ করা, যেমন পশ্চিমঘাটের A. borealis, A. farnsworthi, A. isabellina, A. malabarica এবং উপদ্বীপের সমতলের A. oxyrhyncha। তাই এই লেখায় 'Ahaetulla nasuta complex' বলতে পুরো গোষ্ঠীটিকে বোঝানো হচ্ছে। এটি মৃদু বিষযুক্ত, পেছনের দিকে খাঁজকাটা দাঁতওয়ালা (রিয়ার-ফ্যাংড) সাপ। এর বিষ মূলত ছোট টিকটিকি বা ব্যাঙকে কাবু করার জন্য; মানুষের ক্ষেত্রে কামড়ে সাধারণত সামান্য ফোলা, ব্যথা বা চুলকানির বেশি কিছু হয় না, এবং বাস্তবে একে মানুষের জন্য বিপজ্জনক ধরা হয় না।
নামবদলের ব্যাপারটা পাঠকের কাছে বিভ্রান্তিকর লাগতে পারে, তাই একটু খোলসা করা যাক। পশ্চিমবঙ্গের লাউডগার সঠিক প্রজাতি-নাম নিয়ে গবেষণা চলছে। সেই নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এখানকার সাপকে গোষ্ঠী-নামেই চেনানো নিরাপদ।
কীভাবে চিনবেন
লাউডগা অত্যন্ত সরু ও লম্বা; সাধারণত এক থেকে দেড় মিটার, কখনো দুই মিটারের কাছাকাছি। শরীরের বেড় অনেক সময় একটা আঙুলের চেয়েও কম। রং উজ্জ্বল পাতা-সবুজ, তবে কিছু নমুনা হলদে-বাদামি বা ধূসর হয়। পেটের দুই কিনারা বরাবর হলুদ বা সাদা সরু রেখা দেখা যায়। সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো মাথা: লম্বা, তিনকোনা মাথার ডগায় নাকটা সূচালো হয়ে সামনে বেরিয়ে থাকে।
এর চোখও বিশেষ। মণিটি আড়াআড়ি, অনেকটা ছাগলের চোখের মতো চেরা, আর মাথার দুপাশে চোখ থেকে নাক পর্যন্ত খাঁজ থাকায় সাপটি সামনের দিকে দুই চোখ দিয়ে একসঙ্গে দেখতে পায়। এতে দূরত্ব মাপা সহজ হয়। উত্তেজিত হলে শরীর ফুলিয়ে আঁশের ফাঁকের সাদা-কালো ত্বক দেখায় আর মুখ হাঁ করে ভেতরের কালচে-বেগুনি অংশ মেলে ধরে ভয় দেখায়।
বিস্তার ও বাসস্থান
লাউডগা জাতীয় সাপ ভারতের অধিকাংশ অঞ্চল, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা জায়গায় দেখা যায়। পশ্চিমবঙ্গে গ্রামের বাড়ির পাশের লতানো গাছ, কলাবাগান, পুকুরপাড়ের ঝোপ, আবার উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চলেও এরা পরিচিত। ঘন সবুজ ঝোপঝাড় যেখানে, লাউডগা সেখানে বেশি।
এরা প্রায় পুরো সময় গাছে বা ঝোপে কাটায়। মাটি থেকে সামান্য উঁচু ডালপালা, বেড়ার লতা, জবা বা করবীর মতো বাগানের গাছে চুপচাপ পড়ে থাকে। সবুজ রঙের কারণে পাতার মধ্যে এদের খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন।
আচরণ: ছদ্মবেশের ওস্তাদ
লাউডগা দিনচর। এর শিকারের কৌশল হলো ধৈর্য। শরীরের বড় অংশ ডালে স্থির রেখে সামনের অংশ শূন্যে বাড়িয়ে রাখে, আর বাতাসে দুলে ওঠা লতার মতো সামান্য দোলে, যাতে শিকার বুঝতে না পারে। শিকার কাছে এলে চোখের পলকে ছোবল দিয়ে ধরে ফেলে। মানুষকে দেখলে বেশিরভাগ সময় স্থির হয়ে থাকে, যেন একটা ডাল।
খাদ্যাভ্যাস
এদের প্রধান খাবার গিরগিটি, টিকটিকি ও গেছো ব্যাঙ। মাঝে মাঝে ছোট পাখি বা ইঁদুরও খায়। শিকার ধরার পর পেছনের দাঁত দিয়ে মৃদু বিষ ঢুকিয়ে সেটিকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে, তারপর মাথার দিক থেকে গিলে ফেলে। এই বিষ বড় প্রাণীর ক্ষেত্রে কার্যকর নয়।
প্রজনন
লাউডগা ডিম পাড়ে না, সরাসরি বাচ্চা জন্ম দেয়। স্ত্রী সাপের শরীরের ভেতরে ডিম পরিণত হয় এবং সাধারণত বর্ষার আশপাশে একবারে তিন থেকে দশ-বারোটি বাচ্চা জন্মায় বলে নথিভুক্ত আছে। সদ্যোজাত বাচ্চারা প্রায় পঁচিশ-তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা এবং জন্ম থেকেই স্বাধীন।
সংরক্ষণ ও আইন
IUCN-এর মূল্যায়নে Ahaetulla nasuta "Least Concern"। তবে প্রজাতি ভাগ হওয়ার পর নতুন নামগুলোর আলাদা মূল্যায়ন এখনও সব ক্ষেত্রে হয়নি। বাগান ও ঝোপ কেটে ফেলা, কীটনাশক আর ভয় থেকে হত্যা এদের বড় বিপদ। ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী বন্য সাপ ধরা ও মারা দণ্ডনীয়; এর নির্দিষ্ট তফসিল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বন দপ্তরের সর্বশেষ তালিকা দেখা উচিত।
লোককথা বনাম বিজ্ঞান
বাংলার সবচেয়ে প্রচলিত গল্প, লাউডগা মানুষের চোখ লক্ষ্য করে ছোবল মারে আর চোখ তুলে নেয়। এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সাপটির মুখ মানুষের উচ্চতায় ডালে থাকে বলে কেউ খুব কাছে মুখ নিয়ে গেলে মুখে কামড় লাগতে পারে, কিন্তু চোখ বেছে আক্রমণ করার কোনো প্রবণতা নেই।
আরেকটি ধারণা, লাউডগার কামড়ে মানুষ মারা যায়। লাউডগার কামড়ে মৃত্যুর নির্ভরযোগ্য কোনো নথি নেই; সাধারণত কিছুক্ষণ ব্যথা ও ফোলা থাকে। তবু কামড় হলে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত, কারণ সবুজ রঙের বিষধর সবুজ বোড়াকে অনেকে লাউডগা বলে ভুল করেন। সবুজ বোড়ার মাথা মোটা ত্রিভুজাকার, শরীর ভারী আর লেজের ডগা লালচে; লাউডগার মাথা লম্বা সূচালো আর শরীর সুতোর মতো সরু।
পরিবেশে ভূমিকা ও শত্রু
লাউডগা খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝের ধাপের এক শিকারি। বাগানে গিরগিটি আর গেছো ব্যাঙের সংখ্যা যেন হঠাৎ বেড়ে না যায়, সেই কাজটা নিঃশব্দে করে যায় এই সাপ। অন্যদিকে এদের নিজের শত্রুও কম নয়: শিকরে বাজ, সাপখেকো ঈগল, কাঠবিড়ালি ও বনবিড়াল জাতীয় প্রাণী, এমনকি বড় দাঁড়াশও সুযোগ পেলে লাউডগা ধরে খায়। সবুজ ছদ্মবেশটাই এদের প্রধান আত্মরক্ষা, তাই ঝোপঝাড় কেটে ফাঁকা করে দিলে লাউডগা সহজেই শিকারির চোখে পড়ে যায়।
সুন্দর চেহারার জন্য কোথাও কোথাও লোকে লাউডগা ধরে পোষার চেষ্টা করেন বা ভিডিওর জন্য হাতে নেন। এতে সাপটি প্রচণ্ড চাপে পড়ে, খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং অনেক সময় মারা যায়। তাছাড়া আইনত বন্য সাপ বাড়িতে রাখা যায় না। দূর থেকে ছবি তোলাই এই সাপকে উপভোগ করার সবচেয়ে ভালো উপায়।
বর্ষাকালে কেন বেশি দেখা যায়
বর্ষায় ব্যাঙ আর টিকটিকির সংখ্যা বাড়ে, গাছপালাও ঘন হয়। ফলে লাউডগার খাবার সহজলভ্য হয় এবং এরা বাগানের দিকে বেশি আসে। এই সময়েই নতুন জন্মানো বাচ্চাদেরও দেখা যায়। তাই বর্ষাকালে ঝোপের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় একটু চোখ খোলা রাখলেই অনাকাঙ্ক্ষিত মুখোমুখি হওয়া এড়ানো যায়।
লাউডগার ছবি তোলার সময় সাবধানতা
সাপটি সাধারণত স্থির থাকে বলে অনেকে মোবাইল নিয়ে একদম মুখের সামনে চলে যান। এতে সাপ ভয় পেয়ে আত্মরক্ষায় কামড়াতে পারে। জুম ব্যবহার করে অন্তত দেড় মিটার দূর থেকে ছবি তুলুন, ফ্ল্যাশ এড়িয়ে চলুন এবং ডাল টেনে সাপকে নিচে নামানোর চেষ্টা করবেন না।
লাউডগা দেখলে কী করবেন
- ঝোপে বা লতায় সবুজ সাপ দেখলে মুখ কাছে নেবেন না, অন্তত দেড়-দুই মিটার দূরে থাকুন।
- বাগানে কাজ করার সময় খালি হাতে ঘন লতা সরানোর আগে লাঠি দিয়ে আলতো নেড়ে দেখে নিন।
- ঘরে বা বারান্দায় ঢুকে পড়লে স্থানীয় সাপ উদ্ধারকারীকে খবর দিন; সাপটিকে মারবেন না।
- কামড় লাগলে জায়গাটা ধুয়ে নিন এবং সাপটি সত্যিই লাউডগা কি না নিশ্চিত না হলে দেরি না করে হাসপাতালে দেখান।
সবুজ লতার মতো এই শিল্পী সাপটি আমাদের বাগানের টিকটিকি আর ব্যাঙের সংখ্যায় ভারসাম্য রাখে। একে বোঝা মানেই অহেতুক ভয় কমানো।
তথ্যসূত্র
- Wikipedia: Ahaetulla nasuta
- The Reptile Database: Ahaetulla nasuta
- Mallik et al. 2020, Zootaxa 4874(1): Ahaetulla nasuta species complex revision
- IUCN Red List: Ahaetulla nasuta
- Mallik et al. 2020, Zootaxa 4874(1): Disentangling vines (Ahaetulla nasuta complex)
আরও পড়ুন: ব্রোঞ্জব্যাক ও ভারতীয় অজগর।