ভারতীয় অজগর: ধীর, শান্ত আর বিশাল এক বনের দৈত্য

সাপের নাম শুনলেই যাঁর ছবি সবার আগে মনে ভাসে, তিনি হয়তো অজগর। বিশাল, মোটা শরীর নিয়ে ধীরে ধীরে চলা এই সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম Python molurus, ইংরেজিতে Indian Python বা Indian Rock Python। এটি পাইথনিডি পরিবারের সদস্য এবং সম্পূর্ণ নির্বিষ। অজগর শিকারকে বিষ দিয়ে নয়, শরীর দিয়ে পেঁচিয়ে চাপ দিয়ে মারে। একসময় বার্মিজ পাইথনকেও এর উপপ্রজাতি ধরা হত, এখন সেটি আলাদা প্রজাতি Python bivittatus হিসেবে স্বীকৃত।

ভারতীয় অজগর (Python molurus) – মাটিতে বাদামি ছোপওয়ালা ভারতীয় অজগর, দাহোদ, গুজরাট
ভারতীয় অজগর (Python molurus)। ছবি: Pratik Jain, Wikimedia Commons, লাইসেন্স CC BY-SA 3.0।

চেহারা ও আকার

ভারতীয় অজগর সাধারণত তিন মিটারের কাছাকাছি লম্বা হয়, অনেক প্রাপ্তবয়স্ক নমুনা সাড়ে তিন-চার মিটারে পৌঁছায়। ছয় মিটারের কাছাকাছি দৈর্ঘ্যের পুরনো বিবরণ পাওয়া যায়, তবে তেমন বড় অজগর এখন বিরল। স্ত্রী অজগর পুরুষের চেয়ে বড় ও ভারী হয়। শরীর মোটা ও পেশিবহুল, লেজ তুলনায় ছোট।

গায়ের রং হলদে-বাদামি বা ধূসরাভ, তার ওপর গাঢ় বাদামি, কালো কিনারাযুক্ত বড় বড় অনিয়মিত ছোপ, যেন কার্পেটের নকশা। মাথার ওপরে একটা তিরের ফলার মতো গাঢ় দাগ থাকে, চোখের পাশ দিয়ে একটা গাঢ় রেখা নেমে যায়। ওপরের ঠোঁটের আঁশে তাপ টের পাওয়ার ছোট ছোট গর্ত বা থার্মাল পিট থাকে, যার সাহায্যে অন্ধকারেও উষ্ণ রক্তের প্রাণী খুঁজে নেয়। আঁশ মসৃণ ও ছোট, শরীরের মাঝখানে ষাট থেকে সত্তর সারি পর্যন্ত আঁশ থাকে। পায়ুর দুপাশে পেছনের পায়ের অবশেষ হিসেবে দুটি ছোট নখের মতো কাঁটা দেখা যায়, যা পুরুষদের বেশি বড়।

কোথায় থাকে

অজগরের বিস্তার ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও বাংলাদেশ জুড়ে। পশ্চিমবঙ্গে উত্তরবঙ্গের জলদাপাড়া, গরুমারা ও বক্সার বনাঞ্চল, দক্ষিণবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের শালবন এবং মাঝে মাঝে সুন্দরবনের আশপাশ থেকে অজগরের খবর আসে। গ্রামের দিকে কখনো কখনো ধানক্ষেত বা পুকুরের ধারেও বড় অজগর ধরা পড়ার খবর সংবাদপত্রে দেখা যায়।

পাথুরে পাহাড়ি ঢাল, ঘাসবন, জলাভূমির কিনারা, নদীর চর, ঘন জঙ্গল এবং ম্যানগ্রোভ এলাকায় এদের বাস। জল এদের খুব প্রিয়; অজগর দক্ষ সাঁতারু এবং দীর্ঘ সময় জলের নিচে ডুবে থাকতে পারে। পরিত্যক্ত গর্ত, পাথরের খাঁজ, গাছের ফোকর এদের দিনের আশ্রয়।

আচরণ

অজগর সাধারণত ধীর ও শান্ত। দিনের বেশিরভাগ সময় লুকিয়ে বিশ্রাম নেয়, আর রাত বা সন্ধ্যায় শিকারে বেরোয়। শীতের সময় রোদ পোহাতে বাইরে আসে। এরা ওত পেতে শিকার করে: জল খেতে আসা প্রাণীর পথের ধারে বা জলের কিনারায় দীর্ঘক্ষণ চুপ করে পড়ে থাকে। বিরক্ত করলে জোরে হিস হিস শব্দ করে এবং প্রয়োজনে কামড়াতে পারে; বড় দাঁতের কামড়ে গভীর ক্ষত হতে পারে, যদিও বিষ নেই।

খাদ্যাভ্যাস

অজগরের খাদ্য তালিকায় আছে ইঁদুর, খরগোশ, পাখি, বাঁদর, শজারু, ছোট হরিণ এবং গবাদি পশুর বাচ্চা। শিকার ধরার পর শরীর দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে; প্রতিবার শিকার শ্বাস ছাড়লে পাক আরও শক্ত করে, ফলে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে শিকার মারা যায়। তারপর মাথার দিক থেকে আস্ত গিলে ফেলে। বড় শিকার খাওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ, এমনকি মাসখানেকও না খেয়ে থাকতে পারে।

প্রজনন: মায়ের তাপে ডিম ফোটে

অজগর ডিম পাড়ে, এবং এদের মায়ের যত্ন সরীসৃপদের মধ্যে বিস্ময়কর। শীতের শেষ দিকে মিলনের পর বসন্তে স্ত্রী অজগর সাধারণত আট থেকে একশোটি পর্যন্ত ডিম পাড়ে, সংখ্যাটা মায়ের আকারের ওপর নির্ভর করে। তারপর ডিমের স্তূপকে কুণ্ডলী পাকিয়ে জড়িয়ে রাখে এবং প্রায় দুই মাস পাহারা দেয়। এই সময় মা পেশি ছন্দে ছন্দে কাঁপিয়ে শরীরে তাপ তৈরি করে, যাতে ডিমের তাপমাত্রা ঠিক থাকে। ডিম ফুটলে বাচ্চারা প্রায় পঞ্চাশ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং তারপর মা আর যত্ন নেয় না।

সংরক্ষণ অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা

IUCN-এর লাল তালিকায় ভারতীয় অজগর "Near Threatened", অর্থাৎ ঝুঁকির কাছাকাছি। চামড়ার জন্য ব্যাপক শিকার, মাংস ও তথাকথিত ওষুধের জন্য হত্যা, বন ও জলাভূমি ধ্বংস, আর রাস্তায় গাড়িচাপা এদের সংখ্যা কমিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে CITES-এর পরিশিষ্ট I-এ এই প্রজাতি তালিকাভুক্ত, ফলে বাণিজ্যিক আন্তর্জাতিক কেনাবেচা নিষিদ্ধ।

ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন, ১৯৭২ অনুযায়ী Python গণের সব প্রজাতি তফসিল I-এ রয়েছে। অর্থাৎ বাঘের মতোই সর্বোচ্চ সুরক্ষা পায় অজগর। একে মারা, ধরা, পোষা, খেলা দেখানো বা চামড়া বিক্রি করলে কারাদণ্ড ও জরিমানা দুটোই হতে পারে।

ভুল ধারণা বনাম বাস্তব

শোনা যায়, অজগর শ্বাস টেনে দূর থেকে মানুষ বা পশুকে টেনে নেয়। এটা নিছক গল্প; অজগরের এমন কোনো ক্ষমতা নেই, শিকার কাছে এলে তবেই এরা ধরে। আরেকটা ধারণা, অজগর মানুষ খেতে ঘোরে। ভারতীয় অজগরের মানুষের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত বিরল এবং সাধারণত ধরতে গিয়ে বা উত্ত্যক্ত করার সময়ই ঘটে। তবু বড় অজগরের কাছে শিশু বা একা কাউকে যেতে দেওয়া উচিত নয়।

অনেকে বিশ্বাস করেন অজগরের চর্বি বা হাড় দিয়ে বাত সারে। এর কোনো প্রমাণিত চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই, আর এই বিশ্বাস থেকেই বহু অজগর মারা পড়ে। অজগরের কোনো অঙ্গ কেনা বা ব্যবহার করা আইনত অপরাধও।

পরিবেশে অজগরের গুরুত্ব

বড় আকারের শিকারি হিসেবে অজগর ইঁদুর থেকে শুরু করে বন্য শূকরের বাচ্চা পর্যন্ত নানা প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। আবার অজগরের ডিম ও বাচ্চা বেজি, শিয়াল, শিকারি পাখি ও কুমিরের খাবার। একটা সুস্থ বনে অজগরের উপস্থিতি সেই বনের খাদ্যশৃঙ্খল সম্পূর্ণ থাকার ইঙ্গিত দেয়।

মানুষ আর অজগরের সংঘাত কমানোর উপায়

বনের ধারের গ্রামে মাঝে মাঝে অজগর মুরগি, ছাগলছানা বা বাছুর ধরে নেয়, আর তখন ক্ষুব্ধ মানুষ সাপটিকে মেরে ফেলেন। এই সংঘাত কমানোর সহজ পথ হলো রাতে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগিকে শক্ত, ফাঁকবিহীন ঘরে রাখা এবং খোঁয়াড়ের চারপাশ ঝোপমুক্ত রাখা। গৃহপালিত প্রাণীর ক্ষতি হলে অনেক রাজ্যে বন দপ্তরের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করার নিয়ম আছে; স্থানীয় রেঞ্জ অফিসে খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।

ধরা পড়া অজগরকে নিয়ে মিছিল, সেলফি বা গলায় ঝুলিয়ে ছবি তোলার প্রবণতাও দেখা যায়। এতে সাপটি আহত হয় এবং মানুষও কামড় খেতে পারেন। উদ্ধার করা অজগরকে বন দপ্তর পরীক্ষা করে উপযুক্ত বনে ছেড়ে দেয়, সেটাই সঠিক পথ।

অজগরের মুখোমুখি হলে কী করবেন

  • শান্ত থাকুন এবং অন্তত পাঁচ-ছয় মিটার দূরত্ব রাখুন; বড় অজগর ধীর হলেও ছোবল দ্রুত হয়।
  • ভিড় জমতে দেবেন না, ঢিল বা লাঠি ছুড়বেন না; সাপকে বনের দিকে যাওয়ার পথ খোলা রাখুন।
  • গবাদি পশুর খোঁয়াড় বা বাড়ির কাছে অজগর এলে সঙ্গে সঙ্গে বন দপ্তর বা অনুমোদিত সাপ উদ্ধারকারী দলকে খবর দিন।
  • শিকার গিলে থাকা অজগরকে নাড়াবেন না; ভয় পেলে খাবার উগরে দিতে পারে, এতে সাপটির ক্ষতি হয়।

বিশাল চেহারা দেখে ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ভারতীয় অজগর আসলে লাজুক এক বনবাসী। একে নিরাপদ দূরত্ব থেকে সম্মান করাই আমাদের দায়িত্ব।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন: চন্দ্রবোড়া ও দাঁড়াশ।