খৈয়া গোখরো: ফণায় চশমার ছাপ, ভারতের পরিচিততম সাপ
ভারতের মন্দিরের ভাস্কর্য থেকে সাপুড়ের ঝাঁপি, পুরাণ থেকে লোকগান, সব জায়গায় যে সাপের ছবি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, সেটি খৈয়া গোখরো। কোথাও একে চশমা-গোখরো, গোমা বা শুধু গোখরো বলা হয়। ইংরেজিতে Indian Cobra বা Spectacled Cobra, বৈজ্ঞানিক নাম Naja naja। এলাপিডি পরিবারের এই সাপ ভারতের "বিগ ফোর" বিষধরের অন্যতম এবং দেশজুড়ে সাপের কামড়ের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একই সঙ্গে এটি ইঁদুর নিয়ন্ত্রণকারী এক উপকারী শিকারিও।
চেহারা ও চেনার উপায়
প্রাপ্তবয়স্ক খৈয়া গোখরো সাধারণত এক থেকে দেড় মিটার লম্বা হয়, কিছু নমুনা দুই মিটারের কাছাকাছি পৌঁছায়। রং অঞ্চল অনুযায়ী খুব বদলায়: হলদে-বাদামি, গমরঙা, ধূসর, গাঢ় বাদামি থেকে প্রায় কালো। কিছু সাপের গায়ে হালকা আড়াআড়ি দাগ বা ছিটছিট নকশা থাকে। গলার নিচে, ফণার সামনের দিকে সাধারণত এক বা একাধিক চওড়া কালচে দাগ দেখা যায়, আর ফণার পেছনের দুপাশে কালো ছোপ থাকে।
এর সবচেয়ে বিখ্যাত বৈশিষ্ট্য ফণার পেছনের নকশা: দুটি গোল বৃত্ত একটা বাঁকা রেখায় জোড়া লাগানো, ঠিক চশমার মতো। এজন্যই নাম "স্পেক্টাকলড কোবরা"। তবে কিছু সাপে এই চিহ্ন অস্পষ্ট বা একেবারেই থাকে না, তাই শুধু ফণার নকশা দেখে প্রজাতি সবসময় নিশ্চিত করা যায় না। আঁশ মসৃণ, শরীরের মাঝখানে সাধারণত ২১ থেকে ২৩ সারি। মাথা ঘাড় থেকে সামান্য আলাদা, চোখ মাঝারি, মণি গোল।
কেউটের সঙ্গে পার্থক্য
পশ্চিমবঙ্গে খৈয়া গোখরো আর কেউটে দুটোই পাওয়া যায়, তাই তফাত জানা কাজে লাগে। কেউটের ফণার পেছনে একটাই গোল বৃত্ত বা O চিহ্ন, খৈয়ার ফণায় দুটি বৃত্ত জোড়া চশমার মতো নকশা। কেউটে সাধারণত জলাভূমির কাছে বেশি থাকে, খৈয়া শুকনো মাঠ ও উঁচু জমিতেও সমান স্বচ্ছন্দ। দুটিই সমান বিপজ্জনক, তাই তফাত জানার উদ্দেশ্য শুধু তথ্য, কাছে যাওয়ার অনুমতি নয়।
বিস্তার ও বাসস্থান
Naja naja ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় পাওয়া যায়। ভারতে হিমালয়ের উঁচু অঞ্চল আর মরুভূমির কেন্দ্র বাদে প্রায় সব জায়গায় এরা আছে। পশ্চিমবঙ্গে দক্ষিণ ও পশ্চিমের জেলাগুলো, যেমন বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বীরভূম ও বর্ধমানের লালমাটির এলাকায় এবং অন্যান্য জেলাতেও খৈয়া গোখরো পরিচিত।
খোলা বন, কৃষিজমি, ঘাসজমি, পাথুরে টিলা, গ্রামের বসতি, এমনকি শহরের উপকণ্ঠেও এরা বাস করে। ইঁদুরের গর্ত, উইঢিবি, পুরনো দেয়ালের ফাটল, গাছের ফোকর ও খড়ের গাদা এদের প্রিয় আশ্রয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এদের পাওয়া যায় বলে নথি আছে।
আচরণ
খৈয়া গোখরো মূলত সন্ধ্যা ও রাতে বেশি সক্রিয়, তবে দিনেও খাবারের খোঁজে বেরোয়। বিপদ দেখলে প্রথমে পালানোর চেষ্টা করে। কোণঠাসা হলে শরীরের সামনের অংশ খাড়া করে ফণা মেলে, জোরে হিস হিস করে এবং সামনে ঝুঁকে আঘাতের ভঙ্গি করে। এই প্রদর্শন আসলে সাবধানবাণী; অনেক সময় ছোবল দিলেও বিষ ঢালে না, যাকে "শুকনো কামড়" বলে। তবে কোনো কামড়কেই শুকনো ধরে নিয়ে বসে থাকা চলবে না।
খাদ্যাভ্যাস
খৈয়া গোখরোর প্রধান খাবার ইঁদুর। এর পাশাপাশি ব্যাঙ, টিকটিকি, পাখি, পাখির ডিম এবং অন্য সাপও খায়। ইঁদুরের গর্তে ঢুকে শিকার ধরার ক্ষমতার জন্যই কৃষিজমিতে এদের উপস্থিতি এত বেশি। ফসল রক্ষায় এদের ভূমিকা কৃষকদের কাছে প্রায়ই অজানা থেকে যায়।
প্রজনন
খৈয়া গোখরো ডিম পাড়ে। মিলন সাধারণত শীতের শেষ দিকে হয়, আর এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে স্ত্রী সাপ ইঁদুরের গর্ত বা উইঢিবির ভেতরে দশ থেকে তিরিশটির মতো ডিম পাড়ে। স্ত্রী সাপ ডিম ফোটা পর্যন্ত কাছাকাছি থাকে বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। প্রায় দুই মাস পর ডিম ফোটে, আর বাচ্চারা পঁচিশ-তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা, জন্ম থেকেই বিষধর ও ফণা তুলতে সক্ষম।
বিষ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
খৈয়া গোখরোর বিষে স্নায়ুবিষের পাশাপাশি কোষ-ক্ষতিকারক উপাদান থাকে। ফলে কামড়ের জায়গায় ব্যথা ও ফোলা, পরে ত্বক কালো হয়ে যাওয়া, আর শরীরে চোখের পাতা ঝুলে পড়া, ঢোক গিলতে কষ্ট ও শ্বাসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। ভারতের পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম এই প্রজাতির বিষ দিয়েই তৈরি। ভারতে প্রচলিত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম শুধু 'বিগ ফোর' (খৈয়া গোখরো, কালাচ, চন্দ্রবোড়া, করাত-আঁশ বোড়া)-এর বিষ দিয়ে তৈরি; অন্য সব প্রজাতির জন্য নয়। তাই তাই সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছালে চিকিৎসার ভালো সুযোগ থাকে।
সংরক্ষণ অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা
IUCN লাল তালিকায় Naja naja "Least Concern" হিসেবে রয়েছে। তবে চামড়ার ব্যবসা, সাপুড়েদের খেলা, নাগপঞ্চমীতে ধরে আনা, আবাসস্থল ধ্বংস এবং ভয় থেকে মারা এদের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এটি CITES পরিশিষ্ট II-তে তালিকাভুক্ত। ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইনের বর্তমান তফসিল I-এ Naja গণের সব প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত। সাপুড়ের খেলা দেখানো এই আইনে নিষিদ্ধ।
মিথ বনাম সত্য
সিনেমার "ইচ্ছাধারী নাগিন" বা প্রতিশোধ নিতে ফেরা গোখরোর গল্প নিছক কল্পনা। সাপের এমন স্মৃতি বা প্রতিশোধস্পৃহা নেই, আর মৃত সাপের চোখে খুনির ছবি থেকে যায়, এই গল্পেরও কোনো ভিত্তি নেই। গোখরো বাঁশির সুরে নাচে, এটাও ভুল; সাপ বাতাসে ভাসা শব্দ প্রায় শুনতে পায় না, বাঁশির দোলানোকে হুমকি ভেবে সে সেদিকে ফণা ঘোরায়।
আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস, গোখরোর মাথায় নাগমণি থাকে। কোনো সাপের মাথায় মণি নেই; এই গল্প দেখিয়ে প্রতারকেরা মানুষকে ঠকায়। নাগপঞ্চমীতে দুধ খাওয়ানোর প্রথাও সাপের ক্ষতি করে, কারণ সাপ দুধ হজম করতে পারে না। ধর্মীয় শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে ভালো উপায় হলো বন্য সাপকে তার নিজের জায়গায় নিরাপদে থাকতে দেওয়া।
গোখরোর কামড় হলে করণীয়
- আক্রান্ত মানুষটির পাশে থাকুন, তাঁকে আশ্বাস দিন এবং চুপচাপ শুইয়ে রাখুন; হাঁটা বা দৌড়ানো বন্ধ রাখুন।
- কামড় লাগা অঙ্গটি স্প্লিন্ট বা ঝোলার সাহায্যে এমনভাবে আটকে রাখুন যাতে নড়াচড়া না হয়।
- আংটি, ঘড়ি, বালা, মল বা আঁটো পোশাক খুলে নিন।
- অ্যান্টিভেনম আর শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা পাওয়া যায় এমন হাসপাতালে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পৌঁছান; জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ১০৮ নম্বরে ফোন করা যায়।
যা করবেন না: ক্ষতস্থান কাটা, চুষে বিষ বের করার চেষ্টা, শক্ত বাঁধন বা টুর্নিকেট, বরফ লাগানো, গাছগাছড়া বা ভেষজ প্রলেপ, আর ওঝা-কবিরাজের কাছে যাওয়া, কোনোটাই করবেন না।
খৈয়া গোখরো দেখলে কী করবেন
- ফণা তুললে স্থির থাকুন, তারপর ধীরে পিছু হটে অন্তত তিন-চার মিটার দূরে যান।
- সাপটিকে ঘিরে ভিড় করবেন না, ঢিল ছুড়বেন না; পালানোর পথ খোলা রাখুন।
- বাড়ির ভেতরে বা উঠোনে থাকলে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরকে খবর দিন, আর ইঁদুরের উপদ্রব কমাতে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন।
খৈয়া গোখরো আমাদের সংস্কৃতির অংশ, আমাদের মাঠের রক্ষকও। ভয় আর কুসংস্কার ছেড়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সতর্কতা মেনে চললেই মানুষ ও গোখরো পাশাপাশি নিরাপদে থাকতে পারে।
তথ্যসূত্র
- Wikipedia: Indian cobra (Naja naja)
- The Reptile Database: Naja naja
- IUCN Red List: Naja naja
- Wild Life (Protection) Act 1972, Schedule I (India Code)
- WHO SEARO: Guidelines for the management of snakebites (2nd ed., 2016)
- MoHFW/NCDC: National Action Plan for Prevention and Control of Snakebite Envenoming (NAPSE)
- CITES Appendices I, II and III
- Wikipedia: Indian cobra (altitude up to 2000 m)