দাঁড়াশ বা ধামন সাপ: বাংলার মাঠের নিঃশব্দ ইঁদুর-শিকারি
গ্রামবাংলায় ধানক্ষেত, পুকুরপাড় বা গোয়ালঘরের পাশে লম্বা, চকচকে একটা সাপকে দ্রুত সরে যেতে দেখলে অনেকেই ভয়ে চিৎকার করে ওঠেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটি দাঁড়াশ, যাকে কোথাও ধামন, কোথাও ঢোঁড়া-দাঁড়াশ বলা হয়। বৈজ্ঞানিক নাম Ptyas mucosa, ইংরেজিতে Indian Rat Snake বা Oriental Rat Snake। এটি কলুব্রিডি (Colubridae) পরিবারের নির্বিষ সাপ। মানুষের কোনো বিষক্রিয়ার ঝুঁকি এর কামড়ে নেই, তবে কোণঠাসা হলে বড় দাঁড়াশ জোরে কামড়াতে পারে, ফলে ক্ষতস্থান পরিষ্কার রাখা জরুরি।
চেনার উপায়
দাঁড়াশ ভারতের সবচেয়ে বড় কলুব্রিড সাপগুলোর একটি। প্রাপ্তবয়স্ক সাপ সাধারণত দেড় থেকে আড়াই মিটার লম্বা হয়, কিছু নমুনা দুই মিটার ছাড়ায়, আর এ পর্যন্ত নথিভুক্ত সবচেয়ে লম্বা নমুনা প্রায় ৩.৭ মিটার (Auliya, 2010)। শরীর সরু, লেজ বেশ লম্বা, মাথা ঘাড়ের চেয়ে সামান্য চওড়া আর চোখ বড়, গোল মণিযুক্ত। পিঠের রং জায়গাভেদে হলদে-বাদামি, জলপাই, ধূসর বা প্রায় কালো হতে পারে। শরীরের পেছনের দিকে আর লেজে কালো জালের মতো বা আড়াআড়ি দাগ দেখা যায়, যা এই প্রজাতির ভালো পরিচয়চিহ্ন।
আঁশের হিসাব নিলে দেখা যায়, শরীরের মাঝামাঝি সাধারণত ১৭ সারি পৃষ্ঠীয় আঁশ থাকে এবং পেছনের দিকে আঁশগুলো হালকা খাঁজকাটা বা কিল্ড হয়। ঠোঁটের আঁশের কিনারায় কালো রেখা থাকে, ফলে মুখের পাশটা ডোরাকাটা লাগে। পেটের দিক হলুদাভ সাদা। গোখরোর মতো ফণা এর নেই, তবে ভয় পেলে গলা ফুলিয়ে চাপা গর্জনের মতো শব্দ করে, যা দেখে অনেকে ভুল করে একে গোখরো ভাবেন।
কোথায় পাওয়া যায়
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় দাঁড়াশের বাস, পশ্চিমে ইরান ও আফগানিস্তান থেকে পূর্বে চীন, ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ভারতের প্রায় সব রাজ্যেই এদের দেখা মেলে। পশ্চিমবঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ধানজমি, সুন্দরবন সংলগ্ন গ্রাম থেকে উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের ধার পর্যন্ত এটি অন্যতম সাধারণ বড় সাপ।
এরা খোলা মাঠ, ঝোপঝাড়, জলাশয়ের কিনারা, বাঁশবাগান, শহরতলির খালি জমি এমনকি পুরনো বাড়ির ফাটলেও থাকতে পারে। ইঁদুরের গর্ত এদের প্রিয় আশ্রয়। মানুষের বসতির কাছাকাছি খাবার বেশি বলে লোকালয়ের পাশেই এদের বেশি দেখা যায়, যদিও এরা মানুষকে এড়িয়ে চলতেই পছন্দ করে।
আচরণ ও স্বভাব
দাঁড়াশ মূলত দিনের বেলায় সক্রিয়। সকালের রোদে শরীর গরম করে তারপর শিকারে বেরোয়। মাটিতে এরা খুব দ্রুতগামী, প্রয়োজনে গাছে বা দেয়ালেও উঠতে পারে, আবার সাঁতারেও পারদর্শী। মানুষের সাড়া পেলে প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো পালিয়ে যাওয়া। পালানোর পথ না পেলে শরীর উঁচু করে, গলা ফুলিয়ে শব্দ করে আর লেজ কাঁপিয়ে ভয় দেখায়।
প্রজনন মরসুমে দুটি পুরুষ দাঁড়াশ একে অপরের শরীর জড়িয়ে উঁচু হয়ে ঠেলাঠেলি করে। গ্রামে একে প্রায়ই "সাপের মিলন" বলে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়, আসলে এটি দুই পুরুষের শক্তির লড়াই, যাকে বিজ্ঞানীরা কমব্যাট ডান্স বলেন। কে বেশি উঁচুতে থাকতে পারে, সেই প্রতিযোগিতায় জয়ী পুরুষ স্ত্রী সাপের কাছে যাওয়ার সুযোগ পায়।
খাদ্যাভ্যাস
নামেই বোঝা যায়, ইঁদুর এদের প্রধান খাবার। এর বাইরে ব্যাঙ, টিকটিকি, পাখির ছানা, ডিম, ছোট সাপ এমনকি বাদুড়ও এরা খায়। দাঁড়াশ শিকারকে পেঁচিয়ে মারে না; সাধারণত চোয়ালে চেপে ধরে, মাটিতে ঠেসে রেখে জীবিত অবস্থাতেই গিলে ফেলে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক দাঁড়াশ বছরে বহু ইঁদুর খেয়ে ফসলের ক্ষতি কমায়, ফলে কৃষকের কাছে এটি প্রাকৃতিক কীটনাশকের মতো উপকারী।
প্রজনন
দাঁড়াশ ডিম পাড়া সাপ। মিলন সাধারণত শীতের শেষ থেকে বর্ষার শুরুর মধ্যে হয়। স্ত্রী সাপ গর্ত, পচা পাতার স্তূপ বা মাটির ফাটলে প্রতিবারে মোটামুটি ছয় থেকে পঁচিশটি লম্বাটে ডিম রাখে। প্রায় দুই মাস পরে ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চাগুলো চল্লিশ সেন্টিমিটারের আশপাশে লম্বা হয় এবং জন্মের পরপরই নিজে শিকার ধরতে শুরু করে। বাচ্চাদের গায়ে আড়াআড়ি হালকা ডোরা থাকে, যা বয়সের সঙ্গে ম্লান হয়ে আসে।
সংরক্ষণ অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ বা IUCN-এর লাল তালিকায় দাঁড়াশ "Least Concern" অর্থাৎ ন্যূনতম উদ্বেগের তালিকায় আছে, কারণ এর বিস্তার বিশাল। কিন্তু সাপের চামড়ার অবৈধ বাণিজ্য, রাস্তায় গাড়িচাপা আর ভয় থেকে পিটিয়ে মারা স্থানীয়ভাবে এদের সংখ্যা কমাচ্ছে। এর চামড়া একসময় বিদেশে প্রচুর রপ্তানি হত।
ভারতে বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন, ১৯৭২-এর ২০২২ সালের সংশোধনের পর দাঁড়াশ বা Ptyas mucosa তফসিল I-এর অন্তর্ভুক্ত, অর্থাৎ সর্বোচ্চ স্তরের সুরক্ষা পায়। এই সাপ মারা, ধরা, আটকে রাখা, খেলা দেখানো বা চামড়া বিক্রি করা গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। বিপদে পড়লে অনুমতিপ্রাপ্ত উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরকে খবর দেওয়াই আইনসম্মত পথ।
প্রচলিত ভুল ধারণা ও আসল সত্য
সবচেয়ে প্রচলিত গল্প হলো, দাঁড়াশ রাতে গোয়ালে ঢুকে গরুর পা পেঁচিয়ে দুধ খেয়ে যায়। সাপ স্তন্যপায়ী নয়, দুধ এদের স্বাভাবিক খাবার নয় এবং এর মুখের গঠন দুধ চোষার উপযোগী নয়। গোয়ালে এরা যায় ইঁদুরের খোঁজে, দুধের জন্য নয়।
আরেকটি ধারণা, দাঁড়াশ লেজ দিয়ে চাবুকের মতো মারে আর সেই আঘাতে মানুষ মারা যায়। লেজ নাড়ানো আসলে ভয় দেখানোর ভঙ্গি; লেজের আঘাতে কেউ বিষাক্ত হয় না। অনেকে আবার বলেন, দাঁড়াশ গোখরোর স্ত্রী বা গোখরোর সঙ্গে জোড় বাঁধে। এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন; দুটি আলাদা পরিবারের আলাদা প্রজাতি, এদের মধ্যে প্রজনন সম্ভব নয়। বরং বড় দাঁড়াশকে কখনো কখনো ছোট সাপ শিকার করতেও দেখা যায়।
কেউ কেউ মনে করেন দাঁড়াশ থাকলে বাড়িতে অমঙ্গল হয়। বাস্তবে আশেপাশে দাঁড়াশ থাকা মানে ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আছে। ইঁদুর কমলে ইঁদুর খেতে আসা বিষধর সাপের আনাগোনাও কমতে পারে, তাই পরিবেশের দিক থেকে এটি উপকারী প্রতিবেশী।
উপকারিতা: কেন দাঁড়াশকে বাঁচানো দরকার
ভারতে ইঁদুর প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য নষ্ট করে এবং লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো রোগও ছড়ায়। দাঁড়াশের মতো শিকারি সাপ এই ইঁদুরের বংশবৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখে, বিষ বা ফাঁদের খরচ ছাড়াই। খাদ্যশৃঙ্খলে এরা নিজেও বাজপাখি, গন্ধগোকুল, বেজি আর বড় সাপের খাবার। তাই একটি দাঁড়াশ মেরে ফেলা মানে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে একটা সুতো কেটে দেওয়া।
গোখরোর সঙ্গে দাঁড়াশের পার্থক্য
মাঠে হঠাৎ দেখা হলে দাঁড়াশ আর খৈয়া গোখরোকে গুলিয়ে ফেলা খুব সাধারণ ভুল, কারণ দুটোরই রং বাদামি ঘেঁষা আর দুটোই মাঝারি থেকে বড়। গোখরো বিপদ টের পেলে শরীরের সামনের অংশ খাড়া করে চ্যাপ্টা ফণা মেলে ধরে, অনেক সময় ফণার পেছনে চশমার মতো দাগ দেখা যায়। দাঁড়াশ ফণা মেলে না; গলাটা ওপর-নিচে ফোলায়, আর শরীর তুলনায় অনেক সরু ও লম্বা। দাঁড়াশের চোখ বড় এবং দৌড়ের গতি চোখে পড়ার মতো বেশি। তবু দূর থেকে নিশ্চিত হওয়া কঠিন, তাই যেকোনো বড় বাদামি সাপকে বিষধর ধরে নিয়েই দূরে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ।
দাঁড়াশের মুখোমুখি হলে কী করবেন
- অন্তত দুই-তিন মিটার দূরত্ব রাখুন, সাপকে পালানোর পথ খোলা রাখুন; লাঠি দিয়ে খোঁচাবেন না বা ধরার চেষ্টা করবেন না।
- বাচ্চা ও পোষা প্রাণীকে সরিয়ে নিন, ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লে দরজা খোলা রেখে ঘর ফাঁকা করুন।
- সাপটি না সরলে স্থানীয় প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরের হেল্পলাইনে ফোন করুন; নিজে মারবেন না।
- কোনো কারণে কামড় খেলে ক্ষত সাবান-জলে ধুয়ে নিন এবং নিশ্চিত না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কারণ চেনায় ভুল হতে পারে।
দাঁড়াশকে ভয় না পেয়ে চিনে নিতে শিখলেই গ্রামবাংলার এই উপকারী সাপটি নিরাপদে বেঁচে থাকতে পারে, আর আমরাও নিশ্চিন্তে থাকতে পারি।
তথ্যসূত্র
- Wikipedia: Indian rat snake (Ptyas mucosa)
- The Reptile Database: Ptyas mucosa
- IUCN Red List: Ptyas mucosa
- Wild Life (Protection) Act 1972, Schedule I (India Code)
- Wikipedia: Oriental rat snake (length record, citing Auliya 2010)
আরও পড়ুন: খৈয়া গোখরো ও ভারতীয় অজগর।