চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার: শিকলের নকশায় সাজানো বিপদ
গত কয়েক বছরে পশ্চিমবঙ্গে যে সাপকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে, সেটি হলো চন্দ্রবোড়া। ইংরেজিতে Russell's Viper, বৈজ্ঞানিক নাম Daboia russelii। স্কটিশ প্রকৃতিবিদ প্যাট্রিক রাসেলের নামে এর ইংরেজি নামকরণ। ভাইপারিডি পরিবারের এই সাপ ভারতের "বিগ ফোর"-এর একটি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রকের জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (NAPSE) অনুযায়ী বিগ ফোর মিলে ভারতের প্রায় ৯০ শতাংশ সাপে কাটার ঘটনার জন্য দায়ী। তবে ভয় নয়, সঠিক জ্ঞানই এর থেকে বাঁচার পথ।
একটা কথা আগে বলে রাখা দরকার: পূর্ব এশিয়ার জনগোষ্ঠীকে এখন আলাদা প্রজাতি Daboia siamensis ধরা হয়, আর ভারতীয় উপমহাদেশের সাপটির নাম Daboia russelii।
চেহারা দেখে চেনা
প্রাপ্তবয়স্ক চন্দ্রবোড়া সাধারণত এক মিটারের আশপাশে লম্বা, কিছু নমুনা দেড় মিটার পর্যন্ত হয়। শরীর মোটা ও ভারী, লেজ ছোট। মাথা চ্যাপ্টা, ত্রিভুজাকার এবং ঘাড় থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা, নাকের ছিদ্র বড়। মণি খাড়া। মাথার ওপরের আঁশ ছোট ও খাঁজকাটা, অনেক সাপের মতো বড় প্লেট নেই।
চেনার সবচেয়ে সহজ উপায় পিঠের নকশা। হলদে-বাদামি বা বাদামি জমির ওপর তিন সারি বড় ডিম্বাকার গাঢ় বাদামি ছোপ, প্রতিটির চারপাশে কালো আর তার বাইরে সাদা বা হলুদ কিনারা। পিঠের মাঝের সারির ছোপগুলো অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে জুড়ে শিকলের মতো দেখায়, এজন্য একে "চেন ভাইপার"ও বলা হয়। এই গোল চাঁদের মতো ছোপ থেকেই বাংলা নাম চন্দ্রবোড়া। আঁশ খুব খাঁজকাটা বা কিল্ড, শরীরের মাঝখানে প্রায় ২৭ থেকে ৩৩ সারি।
অজগরের বাচ্চার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা
গ্রামে অনেকে চন্দ্রবোড়াকে অজগরের বাচ্চা ভেবে হাতে তোলেন, যা মারাত্মক ভুল। অজগরের ছোপ অনিয়মিত আকারের, কার্পেটের নকশার মতো, আঁশ মসৃণ ও চকচকে, আর মাথার ওপর তিরের মতো দাগ থাকে। চন্দ্রবোড়ার ছোপ নিয়মিত গোল, সাদা-কালো কিনারায় ঘেরা এবং আঁশ খসখসে। নির্বিষ বালুবোড়াও কখনো এর সঙ্গে গুলিয়ে যায়; সন্দেহ হলে দূরে থাকাই একমাত্র নিরাপদ নিয়ম।
বিস্তার ও বাসস্থান
Daboia russelii ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় পাওয়া যায়। ভারতের প্রায় সব সমতল অঞ্চলেই এরা আছে, পাহাড়ের উঁচু এলাকা বা ঘন বৃষ্টিঅরণ্যে কম। পশ্চিমবঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের বর্ধমান, হুগলি, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, দুই চব্বিশ পরগনা ও মেদিনীপুরের কৃষিজমি থেকে নিয়মিত খবর আসে।
এরা খোলা ঘাসজমি, ধানক্ষেত, আখের খেত, ঝোপঝাড় আর নদীর চর পছন্দ করে। ঘন জঙ্গলে কম থাকে। ইঁদুর যেখানে বেশি, অর্থাৎ ফসলের মাঠ, ধানের গোলা আর খামারবাড়ি, সেখানেই চন্দ্রবোড়ার আনাগোনা বেশি।
আচরণ: পৃথিবীর অন্যতম জোরালো হিসহিস
চন্দ্রবোড়া মূলত রাতে সক্রিয়, তবে শীতকালে দিনেও রোদ পোহাতে দেখা যায়। এরা দৌড়ে পালানোর বদলে নিজের ছদ্মবেশের ওপর ভরসা করে স্থির পড়ে থাকে, ফলে পা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। বিরক্ত হলে কুণ্ডলী পাকিয়ে, মাথা S আকারে পেছনে টেনে, খুব জোরে প্রেশার কুকারের সিটির মতো দীর্ঘ হিসহিস শব্দ করে। সাপের জগতে এটি সবচেয়ে জোরালো হিসহিসের একটি, আর এটাই এর সতর্কবার্তা। ছোবল দ্রুত ও শক্তিশালী, অনেক সময় শরীরের বেশিরভাগ অংশ সামনে ছুড়ে দেয়।
খাদ্যাভ্যাস
প্রাপ্তবয়স্ক চন্দ্রবোড়ার প্রধান খাবার ইঁদুর, ছুঁচো ও কাঠবিড়ালির মতো ছোট স্তন্যপায়ী। বাচ্চারা খায় টিকটিকি, ব্যাঙ আর বড় পোকামাকড়, যেমন শতপদী ও কাঁকড়াবিছে। ফসলের মাঠে ইঁদুর বাড়লে চন্দ্রবোড়াও বাড়ে, তাই কৃষকদের সঙ্গে এর সংস্পর্শ স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
প্রজনন: ডিম নয়, সরাসরি বাচ্চা
চন্দ্রবোড়া ডিম পাড়ে না, ভেতরে ডিম পরিণত করে সরাসরি বাচ্চা প্রসব করে। মিলন সাধারণত বছরের প্রথম দিকে, আর গর্ভকাল ছয় মাসেরও বেশি হতে পারে। মে থেকে নভেম্বরের মধ্যে, বিশেষত জুন-জুলাইয়ে, একবারে কুড়ি থেকে চল্লিশটি বাচ্চা জন্মানো সাধারণ, কখনো এর চেয়েও বেশি বাচ্চার খবর পাওয়া যায়, আবার মাত্র একটিও হতে পারে। সদ্যোজাত বাচ্চারা বিশ-পঁচিশ সেন্টিমিটার লম্বা এবং জন্ম থেকেই পূর্ণ বিষধর। এই বিপুল বংশবৃদ্ধিই কোনো এলাকায় হঠাৎ এদের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ।
বিষ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
চন্দ্রবোড়ার বিষ প্রধানত রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় গোলমাল ঘটায় এবং কোষ নষ্ট করে। কামড়ের জায়গায় দ্রুত ফোলা ও তীব্র ব্যথা, তারপর মাড়ি বা প্রস্রাবে রক্ত, রক্তচাপ পড়ে যাওয়া এবং কিডনির ক্ষতি হতে পারে। কিছু অঞ্চলের বিষে স্নায়ুর প্রভাবও দেখা যায়। ভারতের পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনমে এই প্রজাতির বিষ অন্তর্ভুক্ত। ভারতে প্রচলিত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম শুধু 'বিগ ফোর' (খৈয়া গোখরো, কালাচ, চন্দ্রবোড়া, করাত-আঁশ বোড়া)-এর বিষ দিয়ে তৈরি; অন্য সব প্রজাতির জন্য নয়। তাই তাই দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানোই সবচেয়ে বড় সহায়।
সংরক্ষণ অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা
IUCN লাল তালিকায় Daboia russelii "Least Concern"। ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইনের বর্তমান তফসিল I-এ রাসেলস ভাইপার তালিকাভুক্ত, অর্থাৎ বাঘ বা হাতির মতোই সর্বোচ্চ আইনি সুরক্ষা পায়। সাপটি ভয়ের কারণ হলেও একে মারা আইনত অপরাধ; বিপদে বন দপ্তর ও উদ্ধারকারীর সাহায্য নেওয়া উচিত।
গুজব বনাম বাস্তব
সামাজিক মাধ্যমে প্রায়ই ছড়ায় যে চন্দ্রবোড়া মানুষকে তাড়া করে কামড়ায়। এই সাপ সাধারণত ধীরগতির এবং আক্রমণের বদলে স্থির থেকে হিসহিস করে; বেশিরভাগ কামড় হয় পা পড়ে গেলে বা হাত লাগলে। আরেকটা গুজব, চন্দ্রবোড়ার কামড়ের কোনো চিকিৎসা নেই। এটা ভুল; সময়মতো অ্যান্টিভেনম ও হাসপাতালের যত্নে বহু মানুষ সেরে ওঠেন।
কেউ কেউ বলেন, চন্দ্রবোড়া নদীর জলে ভেসে নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে বলে এখন সব জায়গায় পাওয়া যাবে। এরা সাঁতার কাটতে পারে এবং বন্যায় ভেসে যেতে পারে, কিন্তু আতঙ্ক ছড়ানোর বদলে মাঠে জুতো পরা, টর্চ ব্যবহার আর ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের মতো সাবধানতাই আসল সমাধান।
চন্দ্রবোড়ার কামড়ে প্রাথমিক চিকিৎসা
- আক্রান্তকে শান্ত রাখুন, শুইয়ে দিন বা বসিয়ে রাখুন; দৌড়াদৌড়ি বা হেঁটে হাসপাতালে যাওয়া নয়।
- কামড়ের অঙ্গে হালকা স্প্লিন্ট বাঁধুন বা হাত হলে স্লিং-এ ঝুলিয়ে নড়াচড়া বন্ধ রাখুন।
- দ্রুত ফুলে ওঠার কারণে আংটি, চুড়ি, পায়ের নূপুর ও আঁটো কাপড় সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলুন।
- সরাসরি অ্যান্টিভেনম আছে এমন নিকটবর্তী সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান; রাস্তায় মাড়ি থেকে রক্ত বা প্রস্রাব কমে যাওয়া লক্ষ করলে চিকিৎসককে জানান।
যা করবেন না: কামড়ের জায়গা চিরে দেওয়া, মুখ দিয়ে চোষা, শক্ত দড়ির বাঁধন বা টুর্নিকেট, বরফ ঘষা, শিকড়-বাকড় বা জড়িবুটি, আর ওঝার ঝাড়ফুঁক, সবই বিপজ্জনক এবং সময় নষ্ট।
চন্দ্রবোড়া দেখলে কী করবেন
- হিসহিস শব্দ শুনলেই থামুন, শব্দের উৎস থেকে ধীরে অন্তত তিন মিটার দূরে সরে যান।
- ধান কাটা বা ঘাস কাটার সময় গামবুট বা মোটা জুতো পরুন, লম্বা হাতলের কাস্তে ব্যবহার করুন।
- বাড়ির আশপাশে পাওয়া গেলে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরকে ফোন করুন; নিজে মারতে বা ধরতে যাবেন না।
চন্দ্রবোড়া আমাদের মাঠের ইঁদুর নিয়ন্ত্রণকারী শিকারি, আবার সাবধান না হলে গুরুতর বিপদও। আতঙ্ক নয়, সচেতনতাই এর সঙ্গে সহাবস্থানের চাবিকাঠি।
তথ্যসূত্র
- Wikipedia: Russell's viper (Daboia russelii)
- The Reptile Database: Daboia russelii
- IUCN Red List: Daboia russelii
- Wild Life (Protection) Act 1972, Schedule I (India Code)
- WHO SEARO: Guidelines for the management of snakebites (2nd ed., 2016)
- MoHFW/NCDC: National Action Plan for Prevention and Control of Snakebite Envenoming (NAPSE)
- Wikipedia: Russell's viper (reproduction, litter size)
আরও পড়ুন: করাত-আঁশ বোড়া ও ভারতীয় অজগর।