করাত-আঁশ বোড়া: ছোট শরীর, বড় বিপদ

ভারতের "বিগ ফোর" বিষধর সাপের মধ্যে আকারে সবচেয়ে ছোট হলো করাত-আঁশ বোড়া, ইংরেজিতে Saw-scaled Viper, বৈজ্ঞানিক নাম Echis carinatus। বাংলায় একে কেউ কেউ ফুরসা বা বালিবোড়া বলেও ডাকেন। লম্বায় এক হাতেরও কম হলেও ভারতের সাপের কামড়ের পরিসংখ্যানে, বিশেষ করে শুকনো অঞ্চলে, এর ভূমিকা অনেক বড়। নামটা এসেছে এর বিশেষ ধরনের আঁশ থেকে, যা ঘষে করাতের মতো খসখসে শব্দ তোলে।

করাত-আঁশ বোড়া (Echis carinatus) – মাটিতে কুণ্ডলী পাকানো বাদামি করাত-আঁশ বোড়া, মানগাঁও, মহারাষ্ট্র
করাত-আঁশ বোড়া (Echis carinatus)। ছবি: Shantanu Kuveskar, Wikimedia Commons, লাইসেন্স CC BY-SA 4.0।

কীভাবে চিনবেন

প্রাপ্তবয়স্ক করাত-আঁশ বোড়া সাধারণত তিরিশ থেকে পঞ্চাশ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, আশি সেন্টিমিটারের কাছাকাছি নমুনা খুবই বিরল। শরীর মোটাসোটা, মাথা ছোট কিন্তু ঘাড় থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা, নাকের ডগা ভোঁতা আর চোখ তুলনায় বড়, মণি খাড়া। গায়ের রং বালি-বাদামি, ধূসর, লালচে বা মরচে রঙের, যা মাটির সঙ্গে চমৎকার মিশে যায়।

পিঠের মাঝ বরাবর একসারি সাদাটে বা হালকা রঙের ছোপ থাকে, যার দুপাশে ঢেউখেলানো সাদা রেখা শরীরের দুপাশ দিয়ে চলে গেছে। মাথার ওপরে অনেক সময় একটা সাদা তির বা পাখির পায়ের ছাপের মতো চিহ্ন দেখা যায়। শরীরের দুপাশের আঁশগুলো তির্যক এবং প্রতিটিতে করাতের দাঁতের মতো খাঁজ বা কিল থাকে; এগুলোই শব্দ তৈরির যন্ত্র।

কোথায় পাওয়া যায়

Echis carinatus-এর বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশ থেকে পাকিস্তান, ভারত ও শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত। ভারতে এর ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, গুজরাট, তামিলনাড়ু, কর্নাটক ও অন্ধ্রপ্রদেশের শুকনো, পাথুরে আর বালুকাময় অঞ্চলে। পশ্চিমবঙ্গে এটি সাধারণ সাপ নয়; পশ্চিমের শুকনো লালমাটির কিছু এলাকা থেকে বিক্ষিপ্ত খবর পাওয়া গেলেও দক্ষিণবঙ্গের জলাজমিতে বা উত্তরবঙ্গে একে প্রায় দেখা যায় না। তাই বাংলায় "বালিবোড়া" নামে অনেক সময় অন্য সাপকেও ভুল করে ডাকা হয়।

এরা খোলা ঝোপঝাড়, পাথরের নিচে, শুকনো মাঠ, বালিয়াড়ি, খেতের আল এবং কাঁটাঝোপের মধ্যে থাকে। পাথর বা শুকনো পাতার তলায় লুকিয়ে থাকা স্বভাবের কারণে খেতমজুর ও খালি পায়ে চলা মানুষ বেশি বিপদে পড়েন।

আচরণ: আঁশ ঘষে সতর্কবার্তা

করাত-আঁশ বোড়া মূলত রাতে সক্রিয়, বিশেষত বর্ষার পর এবং গরমের রাতে। বিপদ টের পেলে শরীরকে কয়েকটা অংশে ইংরেজি C বা S আকারে ভাঁজ করে একটার পাশে আরেকটা রাখে এবং সেই ভাঁজগুলো একে অপরের বিপরীতে ঘষতে থাকে। খাঁজকাটা আঁশ ঘষার ফলে "শ্‌-শ্‌" ধরনের খসখসে আওয়াজ হয়, যা গরম তেলে জলের ছিটে পড়ার মতো শোনায়। এই অবস্থান থেকে এরা খুব দ্রুত ছোবল দিতে পারে। মেজাজে এরা তুলনামূলক দ্রুত রেগে যায় এবং আকারে ছোট হওয়ায় সহজে চোখে পড়ে না।

খাদ্যাভ্যাস

এরা বিচ্ছু, শতপদী, বড় পোকামাকড়, ব্যাঙ, টিকটিকি, ছোট ইঁদুর এমনকি ছোট সাপও খায়। অল্পবয়সীরা বেশি খায় পোকামাকড় আর বিচ্ছু, বড় হলে মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভাগ বাড়ে। শুকনো এলাকায় বিচ্ছু আর ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা আছে।

প্রজনন

ভারতীয় জনগোষ্ঠীর করাত-আঁশ বোড়া সাধারণত ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা জন্ম দেয়। মিলনের মরসুম শীতকাল, আর বসন্ত থেকে গ্রীষ্মের মধ্যে স্ত্রী সাপ মোটামুটি তিন থেকে পনেরোটির মতো বাচ্চা প্রসব করে। সদ্যোজাত বাচ্চা দশ-বারো সেন্টিমিটারের মতো লম্বা হলেও পূর্ণ বিষধর।

বিষ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি

এর বিষ প্রধানত রক্তের ওপর কাজ করে। কামড়ের পর ফোলা ও ব্যথার পাশাপাশি রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা নষ্ট হতে পারে, ফলে মাড়ি, ক্ষতস্থান বা প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত দেখা দিতে পারে, আর কিছু ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি হয়। রক্তপাতের লক্ষণ কয়েক ঘণ্টা পরে দেখা দিতে পারে, তাই প্রথমে সব স্বাভাবিক মনে হলেও হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ জরুরি। ভারতের পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনমে এই প্রজাতির বিষ অন্তর্ভুক্ত। ভারতে প্রচলিত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম শুধু 'বিগ ফোর' (খৈয়া গোখরো, কালাচ, চন্দ্রবোড়া, করাত-আঁশ বোড়া)-এর বিষ দিয়ে তৈরি; অন্য সব প্রজাতির জন্য নয়।

সংরক্ষণ অবস্থা ও আইন

IUCN লাল তালিকায় Echis carinatus "Least Concern" হিসেবে মূল্যায়িত, অর্থাৎ বিস্তৃত এলাকায় এরা সাধারণ। ভারতে অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য অনুমোদিত সংস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে বিষ সংগ্রহ করা হয়। বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া বন্য সাপ ধরা, মারা বা রাখা দণ্ডনীয়; এর নির্দিষ্ট তফসিল নিশ্চিত হতে বন দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখা দরকার।

প্রচলিত ভুল ধারণা বনাম বাস্তব

"এত ছোট সাপ, এর কামড়ে কিছু হবে না", এই ভুল ধারণাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। আকার ছোট হলেও এর বিষ রক্তের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। আবার অনেকে এর খসখসে শব্দকে অন্য প্রাণীর আওয়াজ ভেবে কাছে গিয়ে খোঁজেন; অন্ধকারে এমন শব্দ শুনলে টর্চ জ্বেলে দূর থেকে দেখুন।

আরেকটা ভুল বিশ্বাস, বিষাক্ত কামড়ে কামড়ের জায়গা কালো না হলে বিষ ঢোকেনি। রক্তে বিষক্রিয়া বাইরে থেকে দেরিতে বোঝা যায়, আর চিকিৎসকরা "২০ মিনিটের রক্ত জমাট পরীক্ষা"র মতো সহজ পরীক্ষা করে সেটা নির্ণয় করেন। তাই বাড়িতে বসে অপেক্ষা করা চলবে না।

পশ্চিমবঙ্গের পাঠকের জন্য বাড়তি কথা

বাংলায় এই সাপ কম থাকলেও রাজ্যের বাইরে কাজে যাওয়া শ্রমিক, ভ্রমণকারী আর দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে পড়তে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের একে চিনে রাখা দরকার। মহারাষ্ট্রের রত্নাগিরি বা রাজস্থানের মরু অঞ্চলের মতো জায়গায় এটি অত্যন্ত সাধারণ। আবার বাংলার মাঠে ছোট, বাদামি, মোটা মাথার যেকোনো সাপকে করাত-আঁশ বোড়া ভেবে মেরে ফেলার ঘটনাও ঘটে, যার বেশিরভাগই আসলে নির্বিষ সাপ। চেনায় নিশ্চিত না হলে মারার বদলে দূরে থাকাই সঠিক সিদ্ধান্ত।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

যাঁরা রাতে খালি পায়ে মাঠে কাজ করেন, পাথর বা জ্বালানি কাঠ হাতে তোলেন, বা খোলা জায়গায় মাটিতে শোন, তাঁদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, শুকনো রাজ্যগুলোতে কৃষিকাজের মরসুমে এই সাপের কামড় বাড়ে। জুতো, টর্চ আর হাতে লাঠি নিয়ে চলা এই ঝুঁকি অনেকটা কমায়।

করাত-আঁশ বোড়ার কামড়ে জরুরি করণীয়

  • রোগীকে বোঝান যে দ্রুত চিকিৎসায় সেরে ওঠার সম্ভাবনা ভালো; তাঁকে বসিয়ে বা শুইয়ে রাখুন, হাঁটতে দেবেন না।
  • আক্রান্ত হাত বা পা স্প্লিন্ট বা কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা কাঠের পাতের সাহায্যে স্থির করুন, তবে রক্ত চলাচল বন্ধ করবেন না।
  • অঙ্গটি ফুলে যাওয়ার আগে আংটি, নূপুর, চুড়ি বা আঁটো পোশাক সরিয়ে দিন।
  • অ্যান্টিভেনম ও রক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে এমন হাসপাতালে অবিলম্বে যান, কারণ রক্তপাতের লক্ষণ দেরিতে আসতে পারে।

যা করবেন না: ক্ষত চেরা, মুখে চোষা, শক্ত বাঁধন বা টুর্নিকেট, বরফ লাগানো, গাছের রস বা জড়িবুটি এবং ওঝা-ফকিরের কাছে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।

করাত-আঁশ বোড়া দেখলে কী করবেন

  • খসখসে আওয়াজ শুনলে থেমে যান, আলো ফেলে উৎস খুঁজুন এবং অন্তত দুই মিটার পিছিয়ে আসুন।
  • পাথর, ইট বা কাঠ তোলার সময় খালি হাত না দিয়ে লাঠি বা গ্লাভস ব্যবহার করুন।
  • বাড়ির কাছে দেখা গেলে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরকে খবর দিন; নিজে ধরতে যাবেন না।

ছোট্ট এই বোড়া আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাপের বিপদ মাপতে আকার নয়, জ্ঞানই আসল ভরসা।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন: চন্দ্রবোড়া ও কালাচ।