শঙ্খচূড় বা রাজগোখরো: দীর্ঘতম বিষধর সাপগুলোর একটি

পৃথিবীতে যত বিষধর সাপ আছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা হলো শঙ্খচূড়, যাকে বাংলায় রাজগোখরো, রাজসাপ বা কোথাও কোথাও শঙ্খিনী বলা হয়। ইংরেজিতে King Cobra, বৈজ্ঞানিক নাম Ophiophagus hannah। গ্রিক ভাষায় "ওফিওফ্যাগাস" মানে সাপখেকো, আর নামটির পেছনে আছে এর প্রধান খাদ্যাভ্যাস। নাম "কোবরা" হলেও এটি Naja গণের সত্যিকারের গোখরো নয়; নিজের আলাদা গণ Ophiophagus-এর একমাত্র সুপরিচিত সদস্য, এলাপিডি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত।

শঙ্খচূড় (Ophiophagus hannah) – মাথা তুলে থাকা জলপাই-বাদামি শঙ্খচূড়, কেং ক্রাচান জাতীয় উদ্যান, থাইল্যান্ড
শঙ্খচূড় (Ophiophagus hannah), কেং ক্রাচান জাতীয় উদ্যান, থাইল্যান্ড। ছবি: Rushenb (Thai National Parks), Wikimedia Commons, লাইসেন্স CC BY-SA 4.0।

শ্রেণিবিন্যাসে একটা সাম্প্রতিক পরিবর্তন জেনে রাখা ভালো। ২০২৪ সালের এক গবেষণায় রাজগোখরোকে চারটি আলাদা প্রজাতিতে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; পশ্চিমঘাটের জনগোষ্ঠীর নাম রাখা হয়েছে Ophiophagus kaalinga, অর্থাৎ কর্নাটক-কেরালার রাজগোখরো এখন আলাদা প্রজাতি। এই লেখা মূলত উত্তর ও পূর্ব ভারতের O. hannah নিয়ে, আর 'দীর্ঘতম বিষধর সাপ' খ্যাতিটি পুরো রাজগোখরো গোষ্ঠীর রেকর্ড থেকে এসেছে। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের আশপাশের রাজগোখরো সাধারণত উত্তরাঞ্চলীয় দলটির মধ্যে পড়ে, যার জন্য Ophiophagus hannah নামটিই ব্যবহৃত হচ্ছে।

আকার ও চেহারা

প্রাপ্তবয়স্ক রাজগোখরো সাধারণত তিন থেকে চার মিটার লম্বা হয়, আর সবচেয়ে বড় নথিভুক্ত নমুনা প্রায় সাড়ে পাঁচ মিটারের কাছাকাছি। পুরুষ সাধারণত স্ত্রীর চেয়ে বড়। শরীরের রং জলপাই-সবুজ, বাদামি, ধূসর বা প্রায় কালো, তার ওপর হালকা হলুদ বা সাদাটে আড়াআড়ি সরু ডোরা, যা বাচ্চাদের মধ্যে খুব উজ্জ্বল আর বড়দের মধ্যে অনেক সময় ম্লান। গলা ও পেটের সামনের অংশ হলুদাভ বা কমলাটে।

ফণা থাকলেও খৈয়া বা পদ্মগোখরোর মতো চওড়া নয়; বরং লম্বাটে ও সরু, আর ফণার পেছনে চশমা বা বৃত্তের মতো কোনো চিহ্ন থাকে না। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য চেনার উপায় হলো মাথার ওপরের আঁশ: মাথার পেছনের দিকে, প্যারাইটাল আঁশের ঠিক পরে, একজোড়া বড় অক্সিপিটাল আঁশ থাকে, যা অন্য কোনো গোখরোর নেই। আঁশ মসৃণ, শরীরের মাঝখানে সাধারণত ১৫ সারি।

কোথায় থাকে

রাজগোখরোর বিস্তার ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান থেকে দক্ষিণ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ভারতে পশ্চিমঘাট, পূর্বঘাট, হিমালয়ের পাদদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত আর আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে এদের বাস। পশ্চিমবঙ্গে উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চল, বিশেষত জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার বন ও চা-বাগান, এবং সুন্দরবনের কিছু অংশ থেকে রাজগোখরোর খবর পাওয়া যায়।

এরা ঘন চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বন, বাঁশবন, ম্যানগ্রোভ, নদীর ধারের জঙ্গল পছন্দ করে। বন কমে যাওয়ায় এখন কখনো কখনো চা-বাগান, সুপারি বাগান ও বনের ধারের গ্রামেও চলে আসে।

আচরণ

রাজগোখরো দিনচর এবং খুব সতর্ক সাপ। মানুষের উপস্থিতি টের পেলে সাধারণত নিঃশব্দে সরে যায়। কোণঠাসা হলে শরীরের সামনের এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত মাটি থেকে উঁচু করতে পারে, তখন মাথা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের বুকের উচ্চতায় পৌঁছায়। এই অবস্থায় এটি গভীর, প্রায় গর্জনের মতো হিসহিসে শব্দ করে, যা কুকুরের গোঁ গোঁ আওয়াজের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

খাদ্যাভ্যাস

এর প্রধান খাবার অন্য সাপ: দাঁড়াশ, ঢোঁড়া, অজগরের বাচ্চা, এমনকি অন্য বিষধর সাপ যেমন গোখরো আর ক্রেইটও এর শিকার। কখনো কখনো গুইসাপ বা অন্য বড় টিকটিকিও খায়। বড় শিকার খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে পারে। খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে থাকা এই সাপ বনের অন্য সাপের সংখ্যায় ভারসাম্য বজায় রাখে।

প্রজনন: সাপদের মধ্যে বিরল বাসা তৈরি

রাজগোখরো একমাত্র সাপ যারা নিয়মিতভাবে ডিম পাড়ার জন্য বাসা বানায় বলে পরিচিত। স্ত্রী সাপ শরীর দিয়ে শুকনো পাতা ও ডালপালা জড়ো করে একটা ঢিবির মতো বাসা তৈরি করে এবং তার ভেতরে সাধারণত কুড়ি থেকে পঞ্চাশটি ডিম পাড়ে। পচতে থাকা পাতার তাপ ডিমকে উষ্ণ রাখে। স্ত্রী সাপ কয়েক সপ্তাহ ধরে বাসার কাছে পাহারা দেয় এবং এই সময় বেশি আত্মরক্ষাপ্রবণ থাকে। প্রায় দুই-আড়াই মাস পর ডিম ফোটার আগে মা সাধারণত চলে যায়। সদ্যোজাত বাচ্চারা প্রায় পঞ্চাশ সেন্টিমিটার লম্বা, উজ্জ্বল ডোরাকাটা এবং জন্ম থেকেই পূর্ণ বিষযুক্ত।

বিষ

এর বিষ প্রধানত স্নায়ুবিষ। এক কামড়ে অন্য অনেক সাপের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ বিষ ঢুকতে পারে, তাই কামড় গুরুতর জরুরি অবস্থা। তবে মানুষকে কামড়ানোর ঘটনা বিরল, কারণ এরা গভীর বনে থাকে এবং মানুষকে এড়িয়ে চলে। ভারতে প্রচলিত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম রাজগোখরোর জন্য তৈরি নয়, তাই উপযুক্ত সহায়ক চিকিৎসা দিতে পারে এমন বড় হাসপাতালে দ্রুত পৌঁছানো জরুরি।

উত্তরবঙ্গে মানুষ ও রাজগোখরো

ডুয়ার্সের চা-বাগান আর বনবস্তিতে মাঝে মাঝে রাজগোখরো ঘরের চালে, গোয়ালে বা বাগানের নালায় ঢুকে পড়ার খবর আসে। সাধারণত এরা ইঁদুর খেতে আসা দাঁড়াশ বা অন্য সাপের পিছু নিয়েই লোকালয়ে পৌঁছায়। বন দপ্তর ও স্থানীয় উদ্ধারকারী দল এমন সাপ ধরে কাছের গভীর বনে ছেড়ে দেয়। গ্রামবাসীরা যদি সাপটিকে না মেরে খবর দেন, তাহলে মানুষের ঝুঁকি আর সাপের মৃত্যু দুটোই এড়ানো যায়।

সংরক্ষণ অবস্থা ও আইনি সুরক্ষা

IUCN লাল তালিকায় রাজগোখরো "Vulnerable" বা সংকটাপন্ন। বনাঞ্চল ধ্বংস, চামড়া ও মাংসের বাণিজ্য, ঐতিহ্যবাহী ওষুধে ব্যবহার এবং ভয় থেকে হত্যা এর প্রধান বিপদ। CITES-এর পরিশিষ্ট II-তে এই প্রজাতি রয়েছে। ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন, ১৯৭২-এর বর্তমান তফসিল I-এ Ophiophagus গণের সব প্রজাতি তালিকাভুক্ত, তাই একে মারা, ধরা, পোষা বা খেলা দেখানো কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ভুল ধারণা বনাম বাস্তব

গল্প চালু আছে, শঙ্খচূড়ের মাথায় মণি থাকে এবং সেই মণি রাতে আলো দেয়। কোনো সাপের মাথায় মণি থাকে না; এই গল্প দেখিয়ে বহু প্রতারক মানুষকে ঠকায়। আরেকটি বিশ্বাস, একটা রাজগোখরো মারলে তার জোড়া প্রতিশোধ নিতে আসে। সাপের এমন স্মৃতি বা প্রতিশোধের প্রবণতা নেই; একই জায়গায় আরেকটা সাপ দেখা গেলে তার কারণ হলো সেই এলাকা সাপের বসবাসের উপযুক্ত।

অনেকে ভাবেন রাজগোখরো মানুষকে তাড়া করে। প্রকৃতপক্ষে বাসা পাহারা দেওয়ার সময় স্ত্রী সাপ কাছে আসা কাউকে হুমকি দিতে পারে, কিন্তু সাধারণভাবে এটি মানুষের থেকে পালিয়ে যাওয়াই পছন্দ করে। সাপুড়েরা যে "বাঁশির তালে নাচ" দেখায়, তা আসলে বাঁশির নড়াচড়াকে হুমকি ভেবে সাপের আত্মরক্ষার ভঙ্গি; সাপ শব্দের সুর শুনতে পায় না।

রাজগোখরোর কামড়: দ্রুত যা করতে হবে

  • রোগীকে সাহস দিন, শান্তভাবে শুইয়ে রাখুন এবং নিজে হেঁটে যেতে দেবেন না; গাড়ি বা স্ট্রেচারে বহন করুন।
  • কামড়ানো হাত বা পা কাঠের পাত বা ভাঁজ করা কার্ডবোর্ড দিয়ে স্প্লিন্ট করে নড়াচড়া বন্ধ রাখুন।
  • আংটি, চুড়ি, ঘড়ি, জুতো বা আঁটো জামাকাপড় খুলে নিন।
  • এক মুহূর্ত দেরি না করে শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা ও অ্যান্টিভেনম চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে এমন বড় হাসপাতালে নিয়ে যান, সম্ভব হলে আগে থেকে ফোন করে জানান।

যা করবেন না: ক্ষত কেটে রক্ত বের করা, মুখে চুষে নেওয়া, আঁটো বাঁধন দেওয়া, বরফ বা জড়িবুটি লাগানো এবং ঝাড়ফুঁক বা ওঝার ভরসায় সময় নষ্ট করা মারাত্মক ভুল।

রাজগোখরো দেখলে কী করবেন

  • ধীরে ধীরে পিছিয়ে আসুন, হঠাৎ দৌড়াবেন না বা লাঠি ছুড়বেন না; অন্তত পাঁচ-ছয় মিটার দূরত্ব রাখুন।
  • বনের রাস্তায় শুকনো পাতার ঢিবি দেখলে কাছে যাবেন না; সেটা বাসা হতে পারে।
  • বসতির কাছে দেখা গেলে বন দপ্তর বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দলকে সঙ্গে সঙ্গে খবর দিন।

বনের রাজা বাঘ হলে সাপের রাজা নিঃসন্দেহে শঙ্খচূড়। একে বাঁচিয়ে রাখা মানে আমাদের বনগুলোর স্বাস্থ্য বাঁচিয়ে রাখা।

তথ্যসূত্র

আরও পড়ুন: খৈয়া গোখরো ও কেউটে।