শাঁখামুটি: হলুদ-কালো বলয়ের রাতের সাপ
বর্ষার রাতে গ্রামের রাস্তায় বা পুকুরপাড়ে টর্চের আলোয় হলুদ আর কালো চওড়া বলয়ে সাজানো একটা ভোঁতা লেজের সাপ দেখলে বেশিরভাগ মানুষ থমকে দাঁড়ান। বাংলায় এর নাম শাঁখামুটি, কোথাও শাঁখিনী বা শাঁকচূড়ি নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে Banded Krait, বৈজ্ঞানিক নাম Bungarus fasciatus। এটি এলাপিডি পরিবারের সাপ, অর্থাৎ গোখরো আর কালাচের আত্মীয়, এবং এর বিষ শক্তিশালী স্নায়ুবিষ। তবে স্বভাবে এটি আশ্চর্য রকম শান্ত ও অলস, তাই মানুষের কামড় খাওয়ার ঘটনা তুলনায় কম।
চেহারা দেখে চেনা
শাঁখামুটি কালাচের চেয়ে বড়; প্রাপ্তবয়স্ক সাপ সাধারণত এক থেকে প্রায় পৌনে দুই মিটার লম্বা হয়, আর সবচেয়ে বড় রেকর্ড দুই মিটার ছাড়িয়েছে। শরীর জুড়ে প্রায় সমান চওড়া উজ্জ্বল হলুদ ও গাঢ় কালো বলয়, যা পেট পর্যন্ত ঘুরে গেছে। এই বলয় পুরো শরীর ঘিরে থাকায় সাপটিকে পেঁচানো দড়ির মতো দেখায়। মাথা কালো, তার ওপর হলুদ দাগ বা উল্টো V আকারের নকশা থাকতে পারে।
এর আরেকটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো শরীরের আকার। আড়াআড়ি কাটলে শরীর প্রায় ত্রিভুজের মতো, কারণ পিঠের মাঝ বরাবর একটা উঁচু শিরদাঁড়ার মতো খাঁজ চলে গেছে। মেরুদণ্ডের ওপরের আঁশগুলো বড় ও ষড়ভুজাকার। লেজ ছোট এবং ডগাটা সরু না হয়ে ভোঁতা, যেন হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে। পায়ুর পরের আঁশ একসারি, অর্থাৎ ভাগ হয়ে যায় না। মাঝ-শরীরে মসৃণ আঁশের সারির সংখ্যা সাধারণত পনেরো।
কোথায় পাওয়া যায়
শাঁখামুটি পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, মায়ানমার থেকে দক্ষিণ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে আছে। ভারতে পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে এরা ভালোভাবে পরিচিত, মধ্য ভারতের কিছু অংশেও আছে। পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণের নিচু জলাজমি, সুন্দরবনের আশপাশের গ্রাম এবং উত্তরবঙ্গের তরাই এলাকায় এদের দেখা মেলে।
এরা জলের কাছাকাছি থাকতে ভালোবাসে। ধানক্ষেত, খাল-বিলের ধার, পুকুরপাড়ের গর্ত, উইঢিবি, ইঁদুরের গর্ত আর ঝোপঝাড়ের নিচে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে। বর্ষার সময় গর্তে জল ঢুকলে উঁচু জায়গার খোঁজে লোকালয়ে বেশি চলে আসে।
আচরণ: দিনে অলস, রাতে সক্রিয়
শাঁখামুটি নিশাচর। দিনের আলোয় এরা প্রায় নিস্তেজ থাকে; অনেক সময় বিরক্ত করলেও কামড়ায় না, বরং মাথাটা শরীরের কুণ্ডলীর নিচে লুকিয়ে ফেলে আর শরীর এদিক-ওদিক ঝাঁকায়। এই শান্ত স্বভাবের জন্য অনেকে ভুল করে একে নিরীহ ভাবেন, আর সেখানেই ঝুঁকি। রাতে এরা অনেক বেশি সক্রিয় এবং তখন বিরক্ত হলে কামড়াতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস: সাপখেকো সাপ
শাঁখামুটির প্রধান খাবার অন্য সাপ। ঢোঁড়া, জলঢোঁড়া, বালুবোড়া জাতীয় সাপ থেকে শুরু করে কখনো অন্য ক্রেইটও এরা খায়। মাঝে মাঝে মাছ, ব্যাঙ, গিরগিটি আর সাপের ডিমও খাদ্যতালিকায় থাকে। শিকারকে বিষ দিয়ে কাবু করে মাথার দিক থেকে গিলে ফেলে। এভাবে অন্য সাপের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখায় পরিবেশে এদের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে।
প্রজনন
শাঁখামুটি ডিম পাড়ে। সাধারণত গ্রীষ্মের শুরুর দিকে স্ত্রী সাপ গর্ত বা পাতার স্তূপের নিচে চার থেকে চোদ্দটির মতো ডিম পাড়ে বলে উল্লেখ আছে এবং কিছু পর্যবেক্ষণে ডিম পাহারা দেওয়ার কথাও পাওয়া যায়। প্রায় দুই মাস পর ডিম ফোটে; সদ্যোজাত বাচ্চারা প্রায় তিরিশ সেন্টিমিটার লম্বা হয় এবং প্রথম থেকেই বিষযুক্ত।
কালাচ আর শাঁখামুটির তফাত
দুটিই ক্রেইট, দুটিই রাতের সাপ, কিন্তু চেহারায় বেশ আলাদা। কালাচের গায়ে কালচে বা নীলচে-কালো জমির ওপর জোড়ায় জোড়ায় সরু সাদা আড়াআড়ি দাগ, আর সেই দাগ পেট পর্যন্ত পুরো ঘোরে না। শাঁখামুটির বলয় হলুদ ও কালো, প্রায় সমান চওড়া এবং পুরো শরীর ঘিরে থাকে। শাঁখামুটির শরীর পিঠের খাঁজের জন্য তিনকোনা, লেজ ভোঁতা; কালাচের শরীর তুলনায় গোলাকার, লেজ সরু হয়ে শেষ হয়। স্বভাবেও তফাত আছে: কালাচ ঘরের মেঝেতে ঘুমন্ত মানুষকে কামড়ানোর জন্য কুখ্যাত, শাঁখামুটির ক্ষেত্রে এমন ঘটনা অনেক কম।
বিষ ও ঝুঁকি
শাঁখামুটির বিষ প্রধানত স্নায়ুতন্ত্রে কাজ করে। কামড়ের জায়গায় ব্যথা বা ফোলা প্রায় হয় না বললেই চলে, ফলে আক্রান্ত মানুষ প্রথমে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেন না। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চোখের পাতা ঝুলে পড়া, ঢোক গিলতে অসুবিধা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, পেটে ব্যথা এবং পরে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। তাই কামড় সন্দেহ হলেই হাসপাতালে যাওয়া দরকার। ভারতে প্রচলিত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম মূলত কালাচ, গোখরো, চন্দ্রবোড়া ও করাত-আঁশ বোড়ার বিষ দিয়ে তৈরি; শাঁখামুটির ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা সীমিত বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে, ফলে শ্বাসযন্ত্রের সহায়তাসহ হাসপাতালের নিবিড় চিকিৎসাই আসল ভরসা।
সংরক্ষণ অবস্থা ও আইন
IUCN লাল তালিকায় Bungarus fasciatus "Least Concern" হিসেবে রয়েছে। তবু কিছু দেশে ঐতিহ্যবাহী ওষুধ ও খাবারের জন্য এদের ব্যাপক শিকার হয়, আর আমাদের দেশে রাস্তায় গাড়িচাপা ও ভয় থেকে হত্যা বড় সমস্যা। ভারতের বন্যপ্রাণী (সুরক্ষা) আইন অনুযায়ী বন্য সাপ মারা বা ধরা দণ্ডনীয়; এর নির্দিষ্ট তফসিল সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বন দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি দেখা উচিত।
ভুল ধারণা বনাম সত্য
গ্রামে অনেকে বলেন, শাঁখামুটি কামড়ায় না, তাই একে হাতে তোলা যায়। এটা বিপজ্জনক ধারণা; দিনে শান্ত থাকলেও এটি অত্যন্ত বিষধর সাপ। আরেকটা প্রচলিত বিশ্বাস, শাঁখামুটি বাড়িতে এলে লক্ষ্মী আসে বা এটি দেবতার বাহন, তাই একে দুধ-কলা দিতে হয়। সাপ দুধ খায় না, আর এমন আচারের নামে সাপের কাছে যাওয়া মানুষের ঝুঁকি বাড়ায়।
কেউ কেউ শাঁখামুটিকে দুই মাথার সাপ বলেন, কারণ এর ভোঁতা লেজ দেখতে মাথার মতো লাগে এবং বিপদে পড়লে এটি মাথা লুকিয়ে লেজ তুলে ধরে। আসলে মাথা একটাই; লেজের এই চেহারা শিকারিকে বিভ্রান্ত করার কৌশল হতে পারে।
শাঁখামুটির কামড় হলে যা করবেন
- ব্যথা না থাকলেও কামড়কে হালকাভাবে নেবেন না; রোগীকে শুইয়ে বা বসিয়ে শান্ত রাখুন এবং হাঁটতে দেবেন না।
- যে অঙ্গে কামড়, সেটাকে স্প্লিন্ট বা কাপড়ের সাহায্যে নড়াচড়াহীন রাখুন।
- আংটি, বালা, ঘড়ি বা আঁটো পোশাক খুলে দিন।
- যত দ্রুত সম্ভব অ্যান্টিভেনম ও শ্বাসযন্ত্রের সহায়তার ব্যবস্থা আছে এমন সরকারি হাসপাতালে পৌঁছান; রাস্তায় চোখের পাতা ঝুলে পড়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে চিকিৎসকদের জানান।
যা করবেন না: কামড়ের জায়গা কাটা, চুষে বিষ বের করার চেষ্টা, শক্ত বাঁধন বা টুর্নিকেট, বরফ, গাছগাছড়ার প্রলেপ, এবং ওঝা-গুনিনের কাছে যাওয়া একদম নয়।
শাঁখামুটির মুখোমুখি হলে কী করবেন
- রাতে বাইরে বেরোলে টর্চ নিন ও জুতো পরুন, বিশেষ করে বর্ষায় পুকুরপাড় বা ক্ষেতের আল দিয়ে হাঁটার সময়।
- সাপটিকে শান্ত দেখালেও হাত দেবেন না; অন্তত দুই মিটার দূরে সরে দাঁড়ান।
- বাড়ির উঠোনে বা ঘরে থাকলে প্রশিক্ষিত সাপ উদ্ধারকারী বা বন দপ্তরে ফোন করুন।
- শিশু ও পোষা প্রাণীকে জায়গাটা থেকে সরিয়ে নিন, আর সাপটি কোথায় যাচ্ছে দূর থেকে নজর রাখুন।
হলুদ-কালো এই সুন্দর সাপটি ভয়ের চেয়ে বেশি সম্মানের যোগ্য। সঠিক জ্ঞান আর সাধারণ সতর্কতা থাকলে মানুষ ও শাঁখামুটি দুজনেই নিরাপদে থাকতে পারে।